×
×
Thursday, 29 October, 2026, 1:14 pm


পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কর জটিলতা কমানোর উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের

দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণ হারাতে থাকা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নতুন করে বিদেশি পুঁজি প্রবাহ বাড়াতে বড় এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি জারি করা এক নির্দেশনায় অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরীক্ষকের সার্টিফিকেট নেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে।

বিশেষত কর নির্ধারণ ও অর্থ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত পরিপালন খরচ যা বহু ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই জটিলতা দূর করতে এই সিদ্ধান্তকে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

নতুন নিয়মে কী পরিবর্তন হলো

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারিকৃত সার্কুলার অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো এখন থেকে সরাসরি অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রির অর্থ থেকে প্রযোজ্য মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স) আটকে রাখতে পারবে। এর ফলে শেয়ার বিক্রির অর্জিত অর্থ দ্রুত সংশ্লিষ্ট ‘এনআইটিএ’ (অনিবাসী বিনিয়োগকারী টাকা অ্যাকাউন্টে) জমা হচ্ছে, যা পূর্বে সার্টিফিকেট সংক্রান্ত জটিলতায় প্রায় ১৫ দিন পর্যন্ত বিলম্বিত হতো।

পূর্ববর্তী পদ্ধতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি লেনদেনের পর মূলধনী মুনাফার পরিমাণ নির্ধারণের জন্য একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ অপরিহার্য ছিল। ওই সনদ পাওয়ার পরেই অর্থ পুনর্বিনিয়োগ বা বিদেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ থাকত।

এখন কী সুবিধা হলোঃ

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থায় শেয়ার বিক্রির সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা হবে। বিনিয়োগকারী চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে ওই অর্থ দিয়ে পুনরায় শেয়ার ক্রয় করতে পারবেন। তবে অর্থ দেশের বাইরে প্রত্যাবাসনের সময় শুধু তখনই সংশ্লিষ্ট কর কেটে বাকি অংশ প্রেরণ করা যাবে।

অর্থাৎ পুনঃবিনিয়োগ প্রক্রিয়া বর্তমানে অনেক দ্রুততর হবে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে অধিক উৎসাহিত হবেন।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অনুমোদন দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়ন

সিটি ব্রোকারেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মিসবাহ উদ্দিন আফান ইউসুফের মতে, এ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘদিনের বড় অন্তরায় দূর করল। তিনি বলেন, “পূর্বে ক্ষুদ্র লেনদেনের জন্যও ম্যানুয়ালি সিএ (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট) সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা দিতে হতো যা ছোট বিনিয়োগকারীদের কাছে ছিল দুঃস্বপ্নের মতো।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেবল বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কেপিএমজির মতো সংস্থার মাধ্যমে তা সামলাতে পারলেও সাধারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় স্বাধীনভাবে লেনদেনের সুযোগ পাননি। এখন ব্যাংক নিজেই ১৫ শতাংশ কর গণনার বিষয়টি দেখবে এবং শুধুমাত্র অর্থ বিদেশে পাঠানোর সময় সার্টিফিকেট ইস্যু করবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম একে বাজারের জন্য ‘মৌলিক পরিবর্তন’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, মূলধনী মুনাফা কর চালু হওয়ার পর থেকেই এনআইটিএ লেনদেন সহজ করতে ডিএসই এবং ডিবিএ একাধিকবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুরোধ জানিয়েছিল। অবশেষে সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সরলীকৃত নতুন নিয়মে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রয়োজনীয় কর কেটে রাখার পর এনআইটিএ অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স, লভ্যাংশ এবং শেয়ার বিক্রির অর্থ সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রায় স্বচ্ছন্দে বিদেশে প্রেরণ করা সম্ভব হবে।

এনআইটিএ অ্যাকাউন্ট কীভাবে কাজ করেঃ

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক বিনিময় নির্দেশিকা অনুযায়ী, অনাবাসী বাংলাদেশিরা (এনআরবি) ও বিদেশি নাগরিকরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশ থেকে অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা এনে স্থানীয় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন।

এজন্য একজন বিনিয়োগকারীকে দুটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় :

· বৈদেশিক মুদ্রা (এফসি) অ্যাকাউন্ট : বিদেশ থেকে টাকা আনা ও পুনরায় বিদেশে পাঠানোর জন্য।

· এনআইটিএ অ্যাকাউন্ট : বৈদেশিক মুদ্রাকে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে শেয়ার কেনার সুবিধার্থে।

এসব অ্যাকাউন্ট বাংলাদেশের যেকোনো অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকে খোলা যায়। আগে কর সংক্রান্ত নানা জটিলতায় এসব অ্যাকাউন্টের কার্যকারিতা ব্যাহত হলেও নতুন নির্দেশনা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটিকে সহজ ও দ্রুততর করেছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

উদ্যোগটিকে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক বাজারের তারল্য (লিকুইডিটি) বৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা।

[atn_photocard]
আরও