বিশ্বজগতের সৃষ্টি ও অভিভাবকত্ব একমাত্র আল্লাহ
ইউনুস ১০:৩
إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامࣲ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۖ مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ إِذۡنِهِۦۚ ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمۡ فَٱعۡبُدُوهُۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ। যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তারপর আরশে উঠেছেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন। তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদাত কর। তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?
পবিত্র কোরআনের সূরা ইউনুসের ৩ নম্বর আয়াতটি তাওহিদের (একত্ববাদ) মৌলিক শিক্ষা এবং আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার সুস্পষ্ট বর্ণনা দেয়। এই আয়াত মানুষকে সৃষ্টির আদি কারণ ও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সম্পর্কে গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়।
১. সৃষ্টির কাঠামো ও সময়কাল:
আয়াতে ঘোষণা করা হয়, “নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে।” এটি কোরআনের অন্যান্য আয়াতের (যেমন সূরা হুদ, ১১:৭ ও সূরা ক্বাফ, ৫০:৩৮) অনুরূপ। এখানে ‘ছয় দিন’ বলতে আমাদের প্রচলিত পার্থিব দিনকে বোঝানো হয়নি; বরং এটি আল্লাহর কাছে নির্ধারিত ছয়টি পর্ব বা সময়কাল, যার পরিমাণ মানুষের ধারণার বাইরে (সূরা হজ্জ, ২২:৪৭)।
২. আরশে সমাসীন হওয়ার অর্থ:
“তারপর তিনি আরশে উঠেছেন (আরশে ইসতিওয়া)” – এই বক্তব্য আল্লাহর সৃষ্টিজগতের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার প্রতীক। ‘আরশ’ হলো আল্লাহর ক্ষমতার আসন, যা সমগ্র সৃষ্টি জগৎকে পরিবেষ্টন করে আছে (সূরা মুমিন, ৪০:৭)। আর ‘উঠেছেন’ বলতে বস্তুগতভাবে বসাকে বোঝায় না; বরং তা আল্লাহর মহিমা ও সৃষ্টির উপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অর্থ বহন করে।
৩. সার্বিক পরিচালনা ও সুপারিশের শর্ত:
“তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন।” অর্থাৎ প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুর সৃষ্টি, ধ্বংস, পরিচালনা, রিজিক ও ভাগ্য একমাত্র তিনিই নির্ধারণ করেন। এরপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপিত হয়েছে: “তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই।” অর্থাৎ কিয়ামতের দিন কেউ কারও জন্য সুপারিশ করতে পারবে না, যদি না আল্লাহ নিজে অনুমতি দেন। এই অনুমতি কেবলমাত্র নবী ও মুমিনদের জন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রদত্ত হবে (সূরা ত্বহা, ২০:১০৯)।
মানুষের কর্তব্যঃ
আয়াতটির চূড়ান্ত বক্তব্য হলো: “তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদাত কর।” আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ, কোনো ক্ষমতাধর সত্তা নেই যিনি এ সব গুণে গুণান্বিত। তাই প্রতিটি মানুষের কর্তব্য একমাত্র তাঁরই আনুগত্য ও ইবাদাত করা। শেষ লাইনে একটি রাগান্বিত প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়েছে: “তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” – এটি আখিরাতের সফলতার জন্য গাফিলতি ত্যাগ করে সত্যের দিকে ফিরে আসার দাওয়াত।
শিক্ষাঃ
সূরা ইউনুসের এই আয়াতটি মুসলিম জীবনের ভিত্তি নির্ধারণ করে। এটি শিক্ষা দেয়:
1. এই বিশাল সৃষ্টি আকস্মিক নয়; একজন স্রষ্টার পরিকল্পনায় সৃষ্ট।
2. তিনিই একমাত্র ক্ষমতার অধিকারী, অন্য কারও নিজস্ব কোনো কর্তৃত্ব নেই।
3. ‘সুপারিশ’ বা মধ্যস্থতা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা কোরআন খারিজ করে দিয়েছে।
4. আখিরাতে সফল হতে হলে জীবদ্দশায় আল্লাহকে একক ইবাদাতের যোগ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।