“দ্বীন প্রচারের আদর্শ বনাম বর্তমান সংস্কৃতি: একটি পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণ”
লেখক ও গবেষকঃ বারাকাতুল্লাহ
ইসলামি দাওয়াতি কাজের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া। যুগে যুগে নবী-রাসূল ও দাঈগণ এই মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ত্যাগ, সরলতা ও নির্লোভ মানসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের জীবনের মূল প্রেরণা ছিল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি।
কিন্তু বর্তমান সময়ে, বিশেষত বাংলাদেশে জনপ্রিয় কিছু বক্তার যাপনপদ্ধতি ও দ্বীন প্রচারের ধরন নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে যে নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে—তা ইসলামের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
নিচে বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি বাস্তব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হলো—
১. সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের সংস্কৃতি
বর্তমানে অনেক ওয়াজ মাহফিলে ঘণ্টা ভিত্তিক বক্তব্যের বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের পারিশ্রমিক নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করেন, এটি একটি নতুন ‘ট্রেন্ড’ যা কিছু বক্তার মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—দ্বীন প্রচার কি শুধুমাত্র একটি পেশা, নাকি এটি একটি ইবাদত?
যদি এটি ইবাদত হয়, তবে এর মূল চেতনা হওয়া উচিত নিঃস্বার্থতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। অথচ উচ্চ পারিশ্রমিকের এই সংস্কৃতি একদিকে যেমন সাধারণ আয়োজকদের জন্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে দ্বীনের নির্লোভ প্রচারের আদর্শকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২. বিলাসবহুল যাতায়াত ও হেলিকপ্টার প্রীতি
ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, নবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবীরা অত্যন্ত সরল জীবনযাপন করতেন। তারা পায়ে হেঁটে বা সাধারণ বাহনে চড়ে দূর-দূরান্তে গিয়ে দ্বীন প্রচার করেছেন।
এর বিপরীতে বর্তমান সময়ে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, এক মাহফিল থেকে অন্য মাহফিলে যেতে হেলিকপ্টারের মতো বিলাসবহুল পরিবহন ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক সাধারণ মানুষের কাছে এটি দ্বীন প্রচারের প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং আভিজাত্য প্রদর্শনের প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
ফলে দাওয়াতি কাজের মূল বার্তা অনেক সময় আড়াল হয়ে যায়, আর গুরুত্ব পায় বাহ্যিক আয়োজন ও প্রদর্শন।
৩. বাণিজ্যিক প্রকাশনা ও মুনাফা
দ্বীন প্রচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো বই ও জ্ঞানচর্চা। কিন্তু বর্তমানে ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশনার ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
“এক নজরে কুরআন” এর মতো বইয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনের বিষয়টি নৈতিকতার আলোচনায় উঠে আসে। প্রশ্ন হলো—কুরআনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া কি ব্যবসার অংশ হওয়া উচিত, নাকি এটি হওয়া উচিত একটি খেদমত, যেখানে জ্ঞান সবার জন্য সহজলভ্য থাকবে?
অবশ্যই লেখক ও প্রকাশকের ন্যায্য পারিশ্রমিক থাকতে পারে, কিন্তু যখন মুনাফা মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, তখন তা দাওয়াতের পবিত্র উদ্দেশ্যকে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সূরা আশ-শু‘আরা-এর প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহ ➖
দ্বীন প্রচারের বিনিময়ে কোনো প্রকার পার্থিব সুবিধা বা পারিশ্রমিক না নেওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শু‘আরায় নবীগণের দৃঢ় অবস্থান বারবার ঘোষিত হয়েছে। উল্লেখিত বিষয়বস্তু অনুযায়ী আয়াতগুলো নিচে দেওয়া হলো:
হযরত নূহ (আ.) এর ঘোষনা :
وَمَاۤ اَسۡـَٔلُكُمۡ عَلَیۡهِ مِنۡ اَجۡرٍ ۚ اِنۡ اَجۡرِیَ اِلَّا عَلٰی رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ
“আর আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার পুরস্কার তো বিশ্বজাহানের পালনকর্তার কাছেই রয়েছে।”
(সূরা আশ-শু’আরা আয়াত ১০৯)
হযরত হূদ (আ.) এর ঘোষণা :
وَمَاۤ اَسۡـَٔلُكُمۡ عَلَیۡهِ مِنۡ اَجۡرٍ ۚ اِنۡ اَجۡرِیَ اِلَّا عَلٰی رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ
“আর আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার পুরস্কার তো কেবল বিশ্বজাহানের পালনকর্তার কাছেই রয়েছে।”
(সূরা আশ-শু’আরা আয়াত: ১২৭)
হযরত সালেহ (আ.) এর ঘোষনা :
وَمَاۤ اَسۡـَٔلُكُمۡ عَلَیۡهِ مِنۡ اَجۡرٍ ۚ اِنۡ اَجۡرِیَ اِلَّا عَلٰی رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ
“আর আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার পুরস্কার তো বিশ্বজাহানের পালনকর্তার কাছেই রয়েছে।”
(সূরা আশ-শু’আরা আয়াত ১৪৫)
হযরত লূত (আ.) এর ঘোষনা :
وَمَاۤ اَسۡـَٔلُكُمۡ عَلَیۡهِ مِنۡ اَجۡرٍ ۚ اِنۡ اَجۡرِیَ اِلَّا عَلٰی رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ
“আর আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার পুরস্কার তো বিশ্বজাহানের পালনকর্তার কাছেই রয়েছে।”
(সূরা আশ-শু’আরা আয়াত ১৬৪)
হযরত শুআইব (আ.) এর ঘোষনা :
وَمَاۤ اَسۡـَٔلُكُمۡ عَلَیۡهِ مِنۡ اَجۡرٍ ۚ اِنۡ اَجۡرِیَ اِلَّا عَلٰی رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ
“আর আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার পুরস্কার তো কেবল বিশ্বজাহানের পালনকর্তার নিকট রয়েছে।”
(সূরা আশ-শু’আরা আয়াত ১৮০)
পরিশেষেঃ
দ্বীন প্রচার নিছক একটি কাজ নয়; এটি এক মহান ইবাদত, এক গভীর আমানত—যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্তরের ইখলাস, ত্যাগের মানসিকতা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভব। যখন এই পবিত্র দায়িত্ব কেবল পেশাদারিত্ব বা বাণিজ্যিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার আধ্যাত্মিক শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়, আর দাওয়াতের মূল সৌন্দর্য আড়াল হতে থাকে।
নবীদের জীবন আমাদের শিখায়—দ্বীনের দাওয়াত কখনোই অর্থ, আড়ম্বর বা বাহ্যিক চাকচিক্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এর প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে একনিষ্ঠতা, সত্যনিষ্ঠা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি নিবেদনে। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে আধুনিকতার সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা হবে, কিন্তু তা যেন কখনোই দ্বীনের মৌলিক আদর্শকে ম্লান না করে।
এ বাস্তবতায় দায়িত্ব শুধু বক্তাদের নয়, বরং শ্রোতাদেরও। উভয় পক্ষকেই আত্মসমালোচনার সাহস নিয়ে নিজেদের অবস্থান মূল্যায়ন করতে হবে—আমরা কি সত্যিই দ্বীনের খেদমত করছি, নাকি অজান্তেই তাকে একটি প্রদর্শনীর অংশে পরিণত করছি?
অতএব, সময় এসেছে ফিরে তাকানোর—নিজের নিয়ত, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির দিকে। কারণ দ্বীনের দাওয়াত তখনই প্রভাবশালী হয়, যখন তা হৃদয় থেকে উঠে আসে এবং হৃদয়েই পৌঁছায়। আর সেই পথের মূল চাবিকাঠি একটাই—ইখলাস।