নিউজপ্রিন্টে শুল্ক-ভ্যাট কমানোর আহ্বান, বাজেটের আগে নোয়াবের প্রস্তাব”
সংবাদপত্র শিল্পের ওপর আরোপিত বিদ্যমান শুল্ক ও কর কমানোর দাবি জানিয়েছে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। সংগঠনটি বলছে, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বিজ্ঞাপন আয়ের পতন এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের সংবাদপত্র শিল্প বর্তমানে গভীর আর্থিক সংকটে রয়েছে।
রাজধানীর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে নোয়াব নেতারা এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খান। নোয়াব এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোর সঙ্গে যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে এনবিআর।
নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের কারণে পত্রিকা প্রকাশনা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও পত্রিকাগুলো কর্মীদের বেতন বহন করছে, অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনেও এই ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, গত দেড় দশক ধরে সংবাদপত্র শিল্প নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে একটি পত্রিকার এক কপি প্রকাশে প্রায় ২৮ টাকা ব্যয় হলেও পাঠকসংখ্যা ও বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি অন্যান্য শিল্পের মতো সংবাদপত্র শিল্পের জন্যও সরকারি সহায়তার দাবি জানান।
নোয়াবের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবাদপত্র শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। বর্তমানে এ খাতে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক (শর্তসাপেক্ষে), ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম কর দিতে হচ্ছে। ফলে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয়সহ মোট ব্যয় ১৩০ থেকে ১৩২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
সংগঠনটি আরও জানায়, বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর উৎসে কর এবং কাঁচামাল আমদানিতে কর মিলিয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কর দিতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের মোট লাভের চেয়েও বেশি। এই অগ্রিম কর বছরের শেষে সমন্বয় করা সম্ভব না হওয়ায় নগদ অর্থ সংকট তৈরি হচ্ছে। তাই এসব করহার কমানোর দাবি জানানো হয়।
নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেওয়ারও সুপারিশ করেছে নোয়াব। তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই ব্যয় হয় এই কাঁচামালে, যা শিল্পটির টিকে থাকার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া করপোরেট করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং কর্মীদের আয়কর সংক্রান্ত দায় থেকে প্রতিষ্ঠানকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান আশ্বাস দেন, সংবাদপত্র শিল্পে করপোরেট কর বৃদ্ধি করা হবে না এবং অন্যান্য শুল্ক-কর নিয়েও যৌক্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, আগামী অর্থবছর থেকে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের জন্য সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা রিবেট দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।
এছাড়া দেশে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে ই-টিন ও রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স) পুনঃপ্রবর্তনের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন এনবিআর চেয়ারম্যান, যাতে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জাতীয় কোষাগারে বেশি অবদান নিশ্চিত করা যায়।
অন্যদিকে, টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো বিজ্ঞাপন বিলে উৎসে কর অব্যাহতি, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রাপ্ত আয় করমুক্ত করা, অতিরিক্ত কর ফেরতের ব্যবস্থা সহজ করা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব তুলে ধরে।