×
×
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ৭:৫৭ অপরাহ্ণ


ব্রিকস (BRICS) জোটের উত্থান এবং পশ্চিমা অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

বিশ্ব অর্থনৈতিক মানচিত্র বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত পশ্চাত্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি এখন শক্তি সঞ্চয় করে উঠছে ব্রিকস (BRICS) জোট। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত এই জোট সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশকে নিয়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ব্রিকস জোটের উত্থানের কারণ, পশ্চিমা অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করা হবে।

ব্রিকস জোটের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব

ব্রিকস জোট বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি এবং বৈশ্বিক জিডিপির (ক্রয় ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী) প্রায় ৪০% অংশ ধারণ করছে, যা একে জি-সেভেনের (G7) চেয়েও এগিয়ে রেখেছে । আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধির হার হবে ৩.৪%, যা বিশ্ব গড়ের ২.৮% এবং জি-সেভেনের ১.২% প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি । নিচের ছকটি ব্রিকস ও জি-সেভেনের মধ্যে তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

ব্রিকস ও জি-সেভেনের অর্থনৈতিক তুলনা (আনুমানিক)

বিষয় ব্রিকস (BRICS) জি-সেভেন (G7)
বৈশ্বিক জিডিপিতে অংশ (ক্রয় ক্ষমতা সমতা) ৪০% (২০২৫) ২৮% (২০২৫)
২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.০% (২০২৪), ৩.৪% (২০২৫) ১.৭% (২০২৪), ১.২% (২০২৫)
বৈশ্বিক জনসংখ্যার অংশ প্রায় ৫০% প্রায় ১০%
প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য

এ ছাড়া, ব্রিকস জোট বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানির ৪০% এর বেশি নিয়ন্ত্রণ করে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তাদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে ।

পশ্চিমা অর্থনৈতিক আধিপত্যের চ্যালেঞ্জ

ব্রিকস জোটের উত্থান পশ্চিমা অর্থনৈতিক আধিপত্যের জন্য একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, বিশেষ করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থায়ন ব্যবস্থায়।

ডি-ডলারাইজেশন ও বিকল্প অর্থায়ন কাঠামো

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মূলত ডলারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ব্রিকস জোট ধীরে ধীরে এই নির্ভরতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। চীনের তৈরি ক্রস-বর্ডার আন্তঃব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (CIPS) বর্তমানে ১৮৫টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ডলারকে এড়িয়ে সরাসরি ইয়ুয়ানে বাণিজ্য নিষ্পত্তির সুযোগ দিচ্ছে । রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং সুইফট (SWIFT) থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে ।

এছাড়াও, সাংহাইয়ে সদর দপ্তর অবস্থিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) পশ্চিমা ঋণদাতাদের (IMF, World Bank) একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। এই ব্যাংকটি উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ দেয়, যা আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণের মতো কঠোর রাজনৈতিক শর্তে আবদ্ধ নয় । ফলে, ঋণগ্রস্ত অনেক দেশ বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য এটি একটি নতুন আশার আলো ।

বাণিজ্যে নতুন মেরুকরণ

পশ্চিমা বাজার যেখানে শুল্কারোপ ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, সেখানে ব্রিকস নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর জোর দিচ্ছে। গত এক দশকে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ৩০% এরও বেশি বেড়েছে । চীন ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বার্ষিক ১৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে । একইভাবে, রাশিয়া তার জ্বালানি রপ্তানি ইউরোপ থেকে সরিয়ে এশিয়া, বিশেষ করে ভারত ও চীনের বাজারের দিকে নিয়েছে ।

অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ

তবে ব্রিকস জোটের পথ মসৃণ নয়। এর সাফল্যের পথে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো ব্রিকস জোটের সাফল্যকে তাদের আধিপত্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে এবং এটি জোটের জন্য প্রধান বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে । রাশিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটি ফর হিউম্যানিটিজের নॉলেজ ডিপ্লোম্যাসি সেন্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা বিশ্ব নিষেধাজ্ঞা, জোটের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা এবং তথ্য প্রচারণার মাধ্যমে ব্রিকসকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর ওপর শুল্কারোপের হুমকি দিয়েছিলেন, যা বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করে ।

জোটের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও দ্বন্দ্ব

ব্রিকসের প্রধান অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এবং মূল সদস্যদের মধ্যে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব । চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক সদস্য দেশের জন্য উদ্বেগের কারণ, যারা মনে করে জোটটি চীনের একক প্রভাব বলয়ে পরিণত হতে পারে । ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়েও সদস্যদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে ।

অধিকন্তু, সব সদস্যই পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে প্রস্তুত নয়। অনেক দেশ এখনও গভীরভাবে পশ্চিমা অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত । একজন বিশ্লেষকের মতে, “কীভাবে বহুকেন্দ্রিকতা বাস্তবায়ন করতে হয়, তা আমরা পুরোপুরি জানি না। সব দেশ মনে করে না যে পশ্চিমের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা ঝেড়ে ফেলা সম্ভব” ।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ব্রিকস জোট একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার সূচনা করেছে, যা পুরোনো পশ্চাত্য আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি বহুমেরুকৃত বিশ্ব অর্থনীতির পথ তৈরি করছে। যদিও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বাহ্যিক চাপ রয়েছে, তবুও জোটটির অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও জনমিতিক সুবিধা একে আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করবে। জোটটির সাফল্য নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে এবং একটি ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর । পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এটি একটি বার্তা যে, একক আধিপত্যের যুগ শেষ হচ্ছে এবং বিশ্ব এখন আরও বহুমাত্রিক ও জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।

আরও