×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 8:37 am

ছোটদের শিক্ষামূলক গল্প
আলোর বাগান

মানহা

এক ছিল সুন্দর এক শহর। শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল এক বিশাল সাদা মসজিদ। তার মাথায় নীল-সাদা নকশা-করা গম্বুজ, আর চারপাশে আকাশ-ছোঁয়া মিনার। মসজিদের সামনে ছিল এক অপূর্ব বাগান। সেখানে ছিল লাল-গোলাপি গোলাপের ঝোপ, রঙিন ফুলের সারি আর লম্বা লম্বা খেজুর গাছ। বাগানের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট্ট নদী। নদীর জলে ভাসত সবুজ পাতা আর সাদা-গোলাপি শাপলা। নদীর ওপর ছিল নকশা-করা একটি পাথরের সাঁকো।

সেই শহরেই থাকত ছোট্ট মেয়ে নূর। তার বয়স ছয় বছর। তার গোলাপি রঙের হিজাব আর হাসিভরা মুখ দেখলে সবারই মন ভালো হয়ে যেত। নূরের বড় ভাই আমির, বয়স দশ বছর। আমির খুব বুদ্ধিমান, আর ছোট বোনকে আগলে রাখতে ভালোবাসে। তাদের আব্বু ছিলেন সাদা জামা আর সাদা টুপি পরা হাসিখুশি মানুষ, মুখে কালো দাড়ি। আম্মু পরতেন ফুলের নকশা-করা সুন্দর হিজাব।

প্রতি শুক্রবার বিকেলে পুরো পরিবার একসঙ্গে মসজিদের বাগানে বেড়াতে যেত। নূর এই দিনটির জন্য সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করত।

বেড়াতে যাওয়ার দিন

সেদিনও ছিল শুক্রবার। আকাশে সোনালি রোদ, মেঘগুলো যেন গোলাপি তুলোর মতো। নূর দৌড়ে এসে বলল, “আম্মু, আম্মু, তাড়াতাড়ি চলো! সূর্য ডুবে যাবে তো!”

আম্মু হেসে বললেন, “আচ্ছা মা, যাচ্ছি। কিন্তু বেরোনোর আগে কী করতে হয়, মনে আছে?”

নূর একটু ভেবে বলল, “দোয়া পড়তে হয়! আর আব্বু-আম্মুর হাত ধরে চলতে হয়।”

আব্বু খুশি হয়ে বললেন, “ঠিক বলেছ, আমার লক্ষ্মী মেয়ে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমরা বিসমিল্লাহ বলি। তাহলে আল্লাহ আমাদের নিরাপদে রাখেন।”

সবাই একসঙ্গে বিসমিল্লাহ বলে বেরিয়ে পড়ল। নূর এক হাতে আব্বুর হাত ধরল, আরেক হাতে আম্মুর হাত।

সালাম আর হাসি

বাগানের পাথর-বাঁধানো পথ ধরে তারা হাঁটতে লাগল। পথের দুই পাশে ফুলের ঝাড়। বাতাসে গোলাপের মিষ্টি গন্ধ। পথের ধারে ধারে ছোট ছোট লণ্ঠন ঝুলছে। সন্ধ্যা নামলে সেগুলো সোনালি আলোয় জ্বলে উঠবে।

একটু এগিয়েই তাদের সঙ্গে দেখা হলো দুই মহিলার। একজন বেগুনি জামা আর নীল হিজাব পরা, অন্যজন কমলা রঙের জামা পরা। নূর হাসিমুখে বলে উঠল, “আসসালামু আলাইকুম, খালামণিরা!”

খালারা অবাক আর খুশি হয়ে উত্তর দিলেন, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম, সোনামণি! কী মিষ্টি করে সালাম দিলে!”

আব্বু নূরের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “দেখলে নূর, একটা ছোট্ট সালামে সবার মুখে কেমন হাসি ফুটল? সালাম হলো শান্তির দোয়া। যাকেই দেখবে, ছোট হোক বা বড়, আগে সালাম দেবে।”

নূর মাথা নেড়ে বলল, “আমি রোজ সবাইকে সালাম দেব, আব্বু।”

গোলাপের ঝোপের পাশে

কিছুটা এগোতেই নূর থমকে দাঁড়াল। পথের ধারে এক গোলাপের ঝোপ, তাতে টুকটুকে লাল গোলাপ ফুটে আছে। নূরের খুব ইচ্ছে হলো একটা ফুল ছিঁড়ে চুলে লাগাতে। সে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল, এমন সময় আমির আস্তে করে বলল, “নূর, থামো।”

নূর অবাক হয়ে বলল, “কেন ভাইয়া? ফুলটা কত সুন্দর!”

আমির মিষ্টি করে বলল, “সুন্দর বলেই তো ওকে গাছে থাকতে দিতে হয়। ফুল ছিঁড়ে ফেললে কয়েক মিনিটেই শুকিয়ে যায়। তখন আর কেউ ওকে দেখতে পারে না। এই বাগানের ফুল তো সবার জন্য। আজ তুমি ছিঁড়লে কাল যারা আসবে, তারা কী দেখবে?”

আম্মু বললেন, “আমির ঠিক বলেছে। গাছপালা, ফুল, নদী সবই আল্লাহর দেওয়া সুন্দর উপহার। এগুলোর যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”

নূর হাত গুটিয়ে নিয়ে বলল, “ঠিক আছে, আমি ফুল ছিঁড়ব না। শুধু কাছে গিয়ে গন্ধ নেব।” সে নাক ঠেকিয়ে গোলাপের গন্ধ নিল, আর তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। আব্বু বললেন, “এই তো, ভালোবাসা মানে ছিঁড়ে নেওয়া নয়, ভালো রাখা।”

নদীর ধারের ময়লা

তারা নদীর ধারে এল। জল একেবারে পরিষ্কার, নীল আকাশের ছায়া পড়েছে তাতে। শাপলাগুলো ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছে। হঠাৎ আমির দেখল, পাথরের পাশে একটা চকলেটের খালি মোড়ক পড়ে আছে। কেউ হয়তো খেয়ে ফেলে দিয়ে গেছে।

আমির মোড়কটা তুলে নিয়ে বলল, “আব্বু, আশেপাশে তো কোনো ময়লার ঝুড়ি দেখছি না।”

আব্বু বললেন, “এটা পকেটে রেখে দাও বাবা। ঝুড়ি পেলে ফেলে দিও। আমাদের নবীজি (সা.) বলেছেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।”

নূরও এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা ছোট্ট আইসক্রিমের কাঠি খুঁজে পেল। সে বলল, “আমিও একটা পেয়েছি! আমিও নিই?”

আম্মু হেসে বললেন, “হ্যাঁ মা, নাও। এই বাগান আমাদের সবার। আমরা সবাই মিলে পরিষ্কার রাখলে এটা সবসময় সুন্দর থাকবে।”

কিছুদূর গিয়েই একটা সবুজ ঝুড়ি পাওয়া গেল। ভাই-বোন দুজনে মিলে ময়লাগুলো তাতে ফেলে দিল। নূর হাততালি দিয়ে বলল, “আমরা বাগানকে সাহায্য করলাম!”

হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট খোকা

সাঁকোর কাছাকাছি আসতেই নূর একটা কান্নার শব্দ শুনতে পেল। সাঁকোর এক কোণে ছোট্ট একটা ছেলে বসে কাঁদছে। তার বয়স চার-পাঁচ বছর হবে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।

নূর আর দেরি না করে ছেলেটার কাছে গিয়ে নরম গলায় বলল, “তুমি কাঁদছ কেন? আমি নূর। তোমার নাম কী?”

ছেলেটা ফুঁপিয়ে বলল, “আমার নাম রাফি। আমি আম্মুকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

আমির সঙ্গে সঙ্গে আব্বুকে ডাকল। আব্বু রাফির পাশে বসে বললেন, “ভয় পেয়ো না বাবা, আমরা তোমার আম্মুকে খুঁজে দেব। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকো।”

নূর তার নিজের ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটা খেজুর বের করে রাফির হাতে দিয়ে বলল, “এটা খাও, তাহলে মন ভালো হবে।” রাফি চোখ মুছে একটু হাসল।

আব্বু বললেন, “দেখো, বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করা কত বড় ভালো কাজ। কেউ কষ্টে থাকলে মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে নেই। তার পাশে দাঁড়াতে হয়।”

সবাই মিলে রাফিকে নিয়ে বাগানের মসজিদের দিকের পথে হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই দূর থেকে একজন মহিলার ডাক শোনা গেল, “রাফি! রাফি! তুমি কোথায়?”

“আম্মু!” বলে রাফি দৌড়ে গিয়ে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাফির আম্মুর চোখেও জল, কিন্তু সে জল আনন্দের। তিনি নূরদের হাত ধরে বললেন, “আল্লাহ আপনাদের ভালো রাখুন। আপনারা আমার ছেলেকে খুঁজে দিলেন।”

আব্বু বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। সব প্রশংসা আল্লাহর।”

আমির আর নূর দুজনেই বুঝল, কারও উপকার করলে মনটা কী সুন্দর ভরে ওঠে।

বৃদ্ধ দাদুর সঙ্গে দেখা

রাফিদের বিদায় জানিয়ে তারা আবার হাঁটতে লাগল। সাঁকোর ওপারে একজন বৃদ্ধ দাদু ধীরে ধীরে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটছিলেন। তাঁর কাছে একটা ভারী থলে, আর হাঁটতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে।

আমির এগিয়ে গিয়ে বলল, “আসসালামু আলাইকুম, দাদু। আমি কি আপনার থলেটা বয়ে দিতে পারি?”

দাদু হেসে বললেন, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম, বাবা। তুমি তো দেখছি খুব ভদ্র ছেলে। হ্যাঁ, দিলে ভালোই হয়, আজ আমার কোমরটা একটু ব্যথা করছে।”

আমির থলেটা নিয়ে দাদুর পাশে পাশে হাঁটল। নূর দাদুর হাত ধরে সাঁকো পার করে দিল। দাদু বললেন, “আজকাল এমন ভালো ছেলেমেয়ে কমই দেখা যায়। তোমাদের বাবা-মা নিশ্চয়ই তোমাদের খুব সুন্দর শিক্ষা দিয়েছেন।”

আব্বু আর আম্মু একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

দাদু মসজিদের সিঁড়ির কাছে পৌঁছে বললেন, “তোমাদের জন্য আমি দোয়া করব। বড় হয়ে তোমরা আরও ভালো মানুষ হয়ো।”

নূর বলল, “দাদু, আমরা কিন্তু বড়দের সম্মান করি। আব্বু শিখিয়েছেন, বড়দের সম্মান করলে আল্লাহ খুশি হন।”

সন্ধ্যার আলো

এবার সূর্য ডুবতে শুরু করল। আকাশ সোনালি আর গোলাপি রঙে ভরে গেল। দূরের পাম গাছের ফাঁক দিয়ে বড় গোল সূর্যটাকে দেখাচ্ছিল একটা জ্বলন্ত কমলালেবুর মতো। নদীর জলে সেই রং ঝিলমিল করছিল।

ঠিক তখনই বাগানের লণ্ঠনগুলো একে একে জ্বলে উঠল। নরম হলুদ আলোয় পুরো পথ আলো হয়ে গেল। নূর আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, “দেখো আম্মু, লণ্ঠনগুলো কী সুন্দর!”

আম্মু বললেন, “হ্যাঁ মা। আর দূর থেকে মসজিদের মিনারে আজানের সুর ভেসে আসছে, শুনতে পাচ্ছ?”

সবাই চুপ করে দাঁড়াল। মাগরিবের আজানের সুর বাতাসে ভেসে এল। সুরটা এত মিষ্টি যে নূরের মনে হলো, গোটা বাগানটা যেন তা শুনছে।

আব্বু বললেন, “আজান শুনলে আমরা চুপ করে মন দিয়ে শুনি। তারপর নামাজের জন্য প্রস্তুত হই। আমরা আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাই এত সুন্দর দিনের জন্য।”

আল্লাহকে ধন্যবাদ

মসজিদের সিঁড়ির সামনে এসে আমির আর আব্বু জুতো খুলে রাখলেন। আমির বলল, “আব্বু, আমরা তো আজ কত কিছু পেয়েছি—সুন্দর বাগান, ঠান্ডা বাতাস, ভালো মানুষের সঙ্গে দেখা।”

আব্বু বললেন, “ঠিক বলেছ। আর এই সবকিছুর জন্য আমরা আল্লাহকে শুকরিয়া জানাই। যে কৃতজ্ঞ থাকে, সে সবসময় সুখী থাকে।”

নূর জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, আমি কীভাবে শুকরিয়া জানাব?”

আব্বু হেসে বললেন, “মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। আর ভালো কাজ করে, যেমন আজ তুমি করেছ। রাফিকে সাহায্য করেছ, ফুল ছেঁড়োনি, ময়লা পরিষ্কার করেছ, সবাইকে সালাম দিয়েছ। এগুলো সবই আল্লাহর পছন্দের কাজ।”

নূর খুশি হয়ে বলল, “তাহলে আমি রোজ এমন ভালো কাজ করব!”

বাড়ি ফেরার পথে

নামাজ শেষে সবাই আবার বাগানের পথে বেরিয়ে এল। তখন আকাশে একটি দুটি তারা উঁকি দিচ্ছে। লণ্ঠনের আলোয় পথ ঝলমল করছে। নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নূর বলল, “আম্মু, আজকের দিনটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে।”

আম্মু নূরের কপালে চুমু দিয়ে বললেন, “জানো মা, একটা দিন তখনই সবচেয়ে সুন্দর হয়, যখন আমরা অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারি।”

আমির বলল, “আমি আজ বুঝলাম, বড় বড় কাজ না করলেও চলে। সালাম দেওয়া, ময়লা তোলা, কারও থলে বয়ে দেওয়া, এই ছোট ছোট কাজগুলোই আসলে অনেক বড়।”

আব্বু গর্ব করে বললেন, “তোমরা দুজনেই আজ আমাকে খুব খুশি করেছ। মনে রেখো, ছোট ছোট ভালো কাজ জমতে জমতেই একদিন ভালো মানুষ হওয়া যায়।”

সবাই হাত ধরাধরি করে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল। পেছনে বাগানের লণ্ঠনগুলো সোনালি আলোয় জ্বলছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো বাগানটা যেন হাসছে।

সেই রাতে ঘুমানোর আগে নূর বিছানায় শুয়ে ফিসফিস করে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, আজকের সুন্দর দিনের জন্য। আল্লাহ, কাল আমি আরও ভালো মেয়ে হব।”

জানালার বাইরে চাঁদের আলো আর তারার ঝিকিমিকি। নূর হাসিমুখে ঘুমিয়ে পড়ল।

 

গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম

১. দেখা হলে সবাইকে সালাম দিতে হয়।
২. ফুল-গাছ-নদী আল্লাহর উপহার, এদের যত্ন নিতে হয়।
৩. ময়লা যেখানে-সেখানে ফেলতে নেই।
৪. বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করতে হয়।
৫. বড়দের সম্মান করতে হয়।
৬. সবকিছুর জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হয়।
৭. ছোট ছোট ভালো কাজই আমাদের ভালো মানুষ বানায়।

আরও