×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 1:39 pm


মুত্তাকির পরিচয় কী..?

দান, ক্রোধ সংবরণ, ক্ষমা, তওবা ও পাপে অটল না থাকাই মুত্তাকির অন্যতম বৈশিষ্ট্য

ইসলামে একজন মানুষের মর্যাদা নির্ধারণে তাকওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুত্তাকি বলতে এমন মানুষকে বোঝায়, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তাঁর নির্দেশ মেনে চলেন এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। পবিত্র কুরআনের শুরুতেই মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েতের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সূরা আল বাকারার ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, এই কিতাব মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ।

কিন্তু মুত্তাকিদের পরিচয় কী? একজন মানুষ কীভাবে বুঝবেন যে তিনি তাকওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন?

পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ ও ১৩৫ নম্বর আয়াত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই আয়াতে মুত্তাকির এমন কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে, যা শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, পরিবার ও সমাজজীবনকেও সুন্দর করে তুলতে পারে।

আয়াত দুটি হলো:

“যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় দান করে, যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। -সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪

“এবং যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া কে পাপ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনে-শুনে তা বারবার করে না।” -সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৫

এই দুটি আয়াতের আলোকে মুত্তাকিদের প্রধান গুণাবলী নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।

সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতায় দান করার মানসিকতা

আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ব্যয় করে। অর্থাৎ মুত্তাকির প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো দানশীলতা।

সচ্ছল অবস্থায় দান করা অনেকের জন্য তুলনামূলক সহজ। কিন্তু যখন নিজের প্রয়োজনও রয়েছে, তখন অন্যের জন্য কিছু ব্যয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানেই তাকওয়ার পরীক্ষা।

মুত্তাকি ব্যক্তি সম্পদের পরিমাণের দিকে শুধু তাকান না, বরং দানের মানসিকতাকে গুরুত্ব দেন। তার কাছে দান মানে শুধু বিপুল অর্থ ব্যয় করা নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা কিংবা নিজের শ্রম ও সময় দিয়ে কারও উপকার করাও কল্যাণের অংশ।

দানের জন্য বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া অপরিহার্য নয়। বরং অল্পের মধ্য থেকেও দেওয়ার অভ্যাস একজন মানুষের হৃদয়ে উদারতা তৈরি করে। সমাজে এই মানসিকতা বাড়লে ধনী ও দরিদ্রের দূরত্ব কমাতে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্রোধ সংবরণ করা মুত্তাকির বড় পরিচয়

সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতে মুত্তাকিদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, তারা ক্রোধ সংবরণ করে।

রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু রাগের সময় নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারা একটি বড় নৈতিক গুণ। কারণ নিয়ন্ত্রণহীন ক্রোধ মানুষকে এমন কথা বা কাজ করতে বাধ্য করতে পারে, যার ক্ষতি পরে আর সহজে পূরণ করা যায় না।

কুরআন বলেনি যে মুত্তাকিদের কখনো রাগ হয় না। বরং বলা হয়েছে, তারা ক্রোধ সংবরণ করে। অর্থাৎ রাগ অনুভূত হলেও তারা তাকে নিজেদের ওপর কর্তৃত্ব করতে দেয় না।

আরবি ‘কাজম’ শব্দের অর্থের মধ্যে আটকে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করার ধারণা রয়েছে। সেই অর্থে ক্রোধ সংবরণ মানে রাগকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে তা অন্যের ওপর অন্যায়ভাবে প্রকাশ না পায়।

পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য জীবনের অশান্তি, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ কিংবা সামাজিক সংঘাতের পেছনে অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধ বড় ভূমিকা রাখে। তাই রাগের মুহূর্তে নিজেকে থামাতে পারা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়, শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

মানুষকে ক্ষমা করার মহৎ গুণ

ক্রোধ সংবরণের পরই আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে মানুষের প্রতি ক্ষমাশীলতার কথা বলেছেন।

ক্ষমা করা সহজ নয়। কেউ অন্যায় করলে তার প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতে পারে। কিন্তু মুত্তাকি ব্যক্তি প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমাকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

ক্ষমা করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি আত্মসংযম ও মানসিক শক্তির পরিচয়। একজন মানুষ যখন নিজের কষ্ট ও ক্ষোভকে অতিক্রম করে অন্যকে ক্ষমা করেন, তখন তিনি নিজের অন্তরকেও বিদ্বেষের বোঝা থেকে মুক্ত করেন।

আল্লাহ তাআলা এই আয়াতেই বলেছেন, তিনি সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। অর্থাৎ ক্ষমাশীলতা কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়, এটি আল্লাহর ভালোবাসা লাভের পথের একটি গুণ।

বর্তমান সমাজে দীর্ঘদিনের বিরোধ, পারিবারিক সম্পর্কের ভাঙন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরস্পরকে অপমান করার প্রবণতা মানুষের সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় কুরআনের ক্ষমার শিক্ষা আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

যে ব্যক্তি আল্লাহর ক্ষমা প্রত্যাশা করেন, তার নিজেরও অন্যের ভুল ক্ষমা করার মানসিকতা তৈরি করা উচিত।

ভুল হলে আল্লাহকে স্মরণ করে তওবা করা

সূরা আলে ইমরানের ১৩৫ নম্বর আয়াতে মুত্তাকির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে অথবা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মুত্তাকি মানেই এমন মানুষ নয়, যার জীবনে কোনো ভুল কখনো ঘটবে না। মানুষ হিসেবে তারও ভুল হতে পারে। তারও পদস্খলন ঘটতে পারে।

তবে মুত্তাকির সঙ্গে অন্যের পার্থক্য হলো, সে ভুলকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ বানিয়ে নেয় না। ভুল করার পর তার অন্তরে অনুশোচনা জাগে। সে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে।

কুরআন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রশ্ন করেছে, আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করতে পারে?

তাই কোনো গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিনের পথ। তওবার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং সংশোধনের পথে ফিরে আসে।

জেনে শুনে পাপে অটল না থাকা

আয়াতের শেষ অংশে মুত্তাকিদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে। তারা জেনে শুনে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর অটল থাকে না।

এখানে তওবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়। প্রকৃত তওবার সঙ্গে ভুল থেকে ফিরে আসার আন্তরিক চেষ্টা থাকতে হয়।

কেউ যদি কোনো অন্যায় করে এবং বুঝতে পারে যে সে ভুল করেছে, তাহলে তার উচিত সেই কাজ থেকে ফিরে আসা। একই ভুল জেনে শুনে বারবার করে যেতে থাকা মুত্তাকির বৈশিষ্ট্য নয়।

আজকের সমাজে অনেক মানুষ গুনাহকে ছোট করে দেখেন। কেউ মনে করেন, এখন অন্যায় করি, পরে তওবা করব। কিন্তু কুরআনের শিক্ষা হলো, পাপকে হালকা করে দেখা নয়, বরং ভুল হয়ে গেলে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।

মুত্তাকি ব্যক্তি ভুলের পর নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করেন। তিনি পাপের ওপর স্থায়ীভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পরিবর্তে তওবা, আত্মশুদ্ধি ও সৎকর্মের দিকে ফিরে যান।

মুত্তাকি শুধু ইবাদতকারী নন, চরিত্রবান মানুষও

সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ ও ১৩৫ নম্বর আয়াতের শিক্ষা বিশ্লেষণ করলে মুত্তাকির একটি সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আসে।

মুত্তাকি শুধু এমন ব্যক্তি নন, যিনি নামাজ পড়েন বা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন। তার তাকওয়া আচরণেও প্রকাশ পায়। তার হাত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে। তার রাগ নিয়ন্ত্রিত থাকে। তার হৃদয়ে ক্ষমার জায়গা থাকে। ভুল হলে সে আল্লাহকে স্মরণ করে। আর জেনে শুনে পাপের ওপর অটল থাকার পরিবর্তে সংশোধনের পথে ফিরে আসে।

এই গুণগুলো ব্যক্তিজীবনকে যেমন পরিশুদ্ধ করে, তেমনি পরিবার ও সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও জান্নাত

এই গুণাবলি বর্ণনা করার পর পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছেন। সূরা আলে ইমরানের ১৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং এমন জান্নাত, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।

অর্থাৎ দানশীলতা, ক্রোধ সংবরণ, ক্ষমাশীলতা, তওবা এবং পাপে অটল না থাকার মতো গুণ শুধু দুনিয়ার জীবনকে সুন্দর করে না, আখিরাতের সফলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

আমাদের জন্য কুরআনের শিক্ষা

সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ ও ১৩৫ নম্বর আয়াত মানুষের আত্মশুদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। এখানে মুত্তাকির পরিচয় কোনো বাহ্যিক পরিচয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং তার আচরণ, আত্মসংযম, মানুষের প্রতি মনোভাব এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তাকওয়ার পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।

তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকানো। আমরা কি সামর্থ্য অনুযায়ী দান করি? রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? অন্যের ভুল ক্ষমা করার মানসিকতা রাখি? ভুল হলে দ্রুত আল্লাহর কাছে ফিরে আসি? জেনে শুনে কোনো অন্যায়ের ওপর অটল থাকি কি না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আমাদের আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।

আসুন, আমরা কুরআনের এই শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। অল্প হলেও দানের অভ্যাস গড়ে তুলি, ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করি, মানুষকে ক্ষমা করতে শিখি এবং ভুল হয়ে গেলে বিলম্ব না করে আল্লাহর কাছে তওবা করি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গড়ার এবং প্রকৃত মুত্তাকি হওয়ার তাওফিক দান করুন।

আরও