সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে পুরো আমানত তুলতে মুনাফা ও আইনি দাবিও ছাড়তে হচ্ছে
মূল টাকা এককালীন উত্তোলনের আগে আমানতকারীদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে; ভবিষ্যতে মুনাফা দাবি বা মামলা না করার শর্তে ক্ষোভ।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানতের মূল টাকা একসঙ্গে তুলতে গিয়ে মুনাফা, সুদ বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধার দাবি ছাড়তে হচ্ছে আমানতকারীদের। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ওই আমানত নিয়ে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা, অভিযোগ কিংবা অন্য কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার অঙ্গীকারও করতে হচ্ছে।
ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের আগে দুই পৃষ্ঠার একটি ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামায়’ স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, এককালীন মূলধন গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট আমানত হিসাবের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হয়ে যাবে। ফলে পরবর্তী সময়ে ওই আমানত নিয়ে কোনো দাবি, অভিযোগ, মামলা, আবেদন বা আপিল করার সুযোগ থাকবে না।
এই শর্ত নিয়ে আমানতকারীদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেও টাকা নিতে চাইছেন না বলে জানা গেছে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
আর্থিক অনিয়মের কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। ব্যাংক পাঁচটি হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
বর্তমানে ব্যাংকটির মালিকানা সরকারের হাতে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানত ফেরতের কার্যক্রম শুরু হয়।
মূল টাকা তুললেই ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’
ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক যদি তাঁর মূল আমানতের টাকা একসঙ্গে তুলে নিতে চান, তাহলে তাঁকে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। এতে মূল টাকার বাইরে মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি না করার শর্ত রয়েছে।
শুধু বর্তমান আমানতকারী নন, তাঁর উত্তরাধিকারী, নমিনি ও আইনগত প্রতিনিধির ক্ষেত্রেও এসব শর্ত প্রযোজ্য হবে বলে অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। আমানতকারীর নিজের স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে মূল টাকা গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট আমানত হিসাবের সব দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। এরপর ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো দাবি বা অভিযোগ করার সুযোগ থাকবে না এমন শর্তও এতে রাখা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ২১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা আমানত উত্তোলনের আবেদন করেছেন।
এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহক ইতিমধ্যে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন।
অন্যদিকে একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমানত এসেছে। এ সময় নতুন হিসাব খোলা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৪টি। এসব নতুন হিসাবে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা জমা হয়েছে।
হেয়ারকাট না থাকার ঘোষণা, তবুও মুনাফা ছাড়ার শর্ত
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্থিতির ওপর মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল। তখন দুই বছরের মুনাফা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছিল।
তবে ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের আমানতের ওপর কোনো ধরনের হেয়ারকাট থাকবে না। একই সঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা তাঁদের আমানতের মূল অর্থ তুলতে পারবেন বলেও জানানো হয়।
এরপরও মূল টাকা একবারে তুলতে গেলে মুনাফা ও ভবিষ্যৎ আইনি দাবি ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে অনেক আমানতকারী আবেদন করার পরও টাকা নিতে ব্যাংকে যাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়েছিল, তাদের মুনাফাসহ মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই অর্থ ফেরত না পাওয়ার কারণে জরুরি ভিত্তিতে যাঁরা টাকা চাইছেন, তাঁদের মুনাফা কেটে রাখা হচ্ছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাময়িক সংকট কেটে গেলে অন্য আমানতকারীরা মুনাফাসহ তাঁদের অর্থ তুলতে পারবেন।
অঙ্গীকারনামা নিয়ে আমানতকারীদের ক্ষোভ
অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে সব ধরনের দাবি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কয়েকজন আমানতকারীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজনই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
মোহাম্মদ মোতাসিম বিল্লাহ নামে একজন আমানতকারী বলেন, তাঁর দৃষ্টিতে এ ধরনের অঙ্গীকারনামা অবৈধ এবং এটি আমানতকারীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ। তিনি এর প্রতিকার ও ন্যায্যতা দাবি করেন।
অন্যদিকে আবদুর রহমান নামে একজন আমানতকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উদ্দেশে অভিযোগ করেন, জরুরি আবেদন সর্বোচ্চ তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা বলা হলেও শাখাগুলোতে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
তিনি জানান, ৬ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন ব্যাংকের রাজশাহী শাখায় আবেদন করার পর তাঁকে কয়েক দফা যোগাযোগ করতে বলা হয়। কর্মসূত্রে বগুড়ায় অবস্থান করায় নির্ধারিত সময়ে ছুটি নিয়ে ব্যাংকে যাওয়ার পরও আবেদন অনুমোদন হয়নি বলে তাঁকে জানানো হয়।
আরেক আমানতকারী আকিকুল বাশার চৌধুরী দাবি করেন, হেয়ারকাট বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারির পরও ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ময়মনসিংহ সদর শাখায় সেটি পৌঁছায়নি। মেয়াদ শেষ হওয়া এফডিআর ও ডিপিএস ভেঙে জরুরি প্রয়োজনে আংশিক অর্থ উত্তোলনের আবেদন করলেও ২০ দিনেও প্রধান কার্যালয় থেকে অনুমোদন পাওয়া যায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ ও হিসাব পুনর্গঠনের উদ্যোগ
এদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপককে ব্যক্তিগত মেয়াদি আমানত এবং বিভিন্ন স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ ও আমানতের স্থিতি পুনর্হিসাবের বিষয়ে চিঠি দিয়েছে।
তবে নতুন মুনাফার হার কত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
একই চিঠিতে মৃত আমানতকারীর হিসাবের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে উত্তরাধিকারী বা বৈধ দাবিদারের কাছে অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব হিসাব ব্লক রয়েছে, সেগুলোও প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে আনব্লক করে অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সামনে একাধিক প্রশ্ন
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত ফেরতের উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক আবেদন করলেও মূল টাকা এককালীন উত্তোলনের সঙ্গে মুনাফা ও ভবিষ্যৎ আইনি দাবি ছাড়ার শর্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একদিকে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে আমানতকারীদের একটি অংশ অঙ্গীকারনামার শর্ত নিয়ে আপত্তি তুলছেন। পাশাপাশি মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ ও হিসাব পুনর্হিসাবের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরত কার্যক্রমে মূল অর্থ দ্রুত পাওয়ার প্রত্যাশা, মুনাফার অধিকার এবং ভবিষ্যৎ আইনি দাবির বিষয়গুলো বর্তমানে আমানতকারীদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।