×
×
Wednesday, 5 August, 2026, 2:18 pm

প্রবাসীর টাকায় বিকাশের সাম্রাজ্য?
ডিজিটাল লেনদেনে বিকাশের আধিপত্য, বাড়ছে নানা প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রবাসীদের ঘাম-শ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পরিবারকে স্বচ্ছল রাখা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাড়িঘর নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় সব ক্ষেত্রেই প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একসময় বিদেশ থেকে দেশে টাকা পাঠাতে ব্যাংক, মানি অর্ডার কিংবা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতো। সময় লাগত, খরচ ছিল, ঝুঁকিও ছিল।

প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সেই বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাংলাদেশিরা বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠালে তা দ্রুত পরিবারের সদস্যের মোবাইল ফোনে পৌঁছে যেতে পারে। এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় অংশীদার হয়ে উঠেছে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এমএফএস। আর বাংলাদেশের এমএফএস খাতের সবচেয়ে পরিচিত ও শক্তিশালী নামগুলোর একটি হলো বিকাশ।

কিন্তু এখানেই নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রযুক্তি কি মানুষের আর্থিক লেনদেনের খরচ কমিয়েছে, নাকি ডিজিটাল লেনদেনের নতুন কাঠামোর মধ্যে কিছু অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে? একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের বিপুল গ্রাহক, এজেন্ট ও মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক তৈরি হলে বাজারে প্রতিযোগিতা কতটা থাকে? আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা বা এক ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সহজে টাকা স্থানান্তরের সুযোগ কতটা নিশ্চিত হয়েছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রবাসী যে অর্থ পরিবারের জন্য পাঠান, সেটি পরিবারের হাতে পৌঁছানোর শেষ ধাপে মোট খরচ কত?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিকাশের ব্যবসায়িক উত্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশের পুরো ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে।

১৮ টাকা ৫০ পয়সার হিসাব

প্রতি হাজার টাকা ক্যাশ-আউটে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা শুনতে খুব বড় অঙ্ক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের বিপুল লেনদেনের ওপর এই ছোট অঙ্কের চার্জই একটি বিশাল ব্যবসায়িক প্রবাহ তৈরি করতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো প্রবাসী যদি পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা পাঠান এবং সেই অর্থের পুরোটা নগদে তুলতে হয়, তাহলে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে ক্যাশ-আউট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রবাসী যে অর্থ পাঠিয়েছেন, পরিবারের হাতে নগদে পৌঁছানোর শেষ ধাপেই একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খরচ হয়ে যেতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি ক্যাশ-আউট চার্জকে সরাসরি বিকাশের মুনাফা হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয়। এর সঙ্গে এজেন্ট কমিশন, পরিচালন ব্যয়, প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রক কাঠামোসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত থাকে। ফলে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা পুরো চার্জ কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নিট আয় নয়।

তবু প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য যদি মানুষের লেনদেনকে সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে লেনদেনের খরচ কীভাবে আরও কমানো যায়?

এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন প্রতিবেশী দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা সামনে আসে।

বিকাশ ব্যাংক নয়, এমএফএস প্রতিষ্ঠান

বিকাশকে নিয়ে জনমনে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে মোবাইলে টাকা রাখার কারণে এটি অনেকটা ব্যাংক হিসাবের মতো। বাস্তবে বিকাশ একটি ব্যাংক নয়; এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবস্থার একটি প্রতিষ্ঠান।

এমএফএস ব্যবস্থায় গ্রাহকের মোবাইল ওয়ালেটে থাকা অর্থ এবং ব্যাংকের আমানত এক বিষয় নয়। ব্যাংকে রাখা অর্থ আইনগতভাবে আমানত হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে এমএফএস ওয়ালেটে থাকা অর্থকে ইলেকট্রনিক মানি বা ই-মানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সহজভাবে বলা যায়, গ্রাহক যখন মোবাইল ওয়ালেটে টাকা রাখেন, তখন সেই অর্থের বিপরীতে ডিজিটালভাবে তার পাওনা বা দায় সৃষ্টি হয়। গ্রাহকের ওয়ালেটে যে অর্থ দেখা যায়, তার বিপরীতে সমপরিমাণ তহবিল নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এমএফএস প্রতিষ্ঠানের ওয়ালেটে কোটি কোটি গ্রাহকের ছোট ছোট অঙ্ক জমা হয়ে বড় একটি তহবিল তৈরি হয়। সেই অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকার ফলে তার বিপরীতে যে আর্থিক আয় তৈরি হয়, তার কাঠামো ব্যাংক আমানতের সুদের মতো সরাসরি গ্রাহকের হাতে যায় না। ফলে ই-মানি ও ব্যাংক আমানতের পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

ব্র্যাক ব্যাংকের মালিকানা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ

বিকাশের মালিকানা কাঠামোও এই ব্যবসার ব্যাপ্তি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের ব্র্যাক ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশীদারিত্ব রয়েছে।

তাই বিকাশের মালিকানার দিকে তাকালে দেখা যায়:

✅ ব্র্যাক ব্যাংক (বাংলাদেশ): ৫১%

✅ মানি ইন মোশন (যুক্তরাষ্ট্র): ১৬.৫%

✅ আলীপে (সিঙ্গাপুর/চীন): প্রায় ১৫%

✅ আইএফসি (বিশ্বব্যাংক গ্রুপ): ১০%+

✅ সফটব্যাংক (জাপান): ৯.৫%

অর্থাৎ বিকাশকে কেবল একটি স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত কাঠামো বোঝা যাবে না। এটি স্থানীয় ব্যাংকিং অংশীদারিত্ব, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি বড় ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্ম।

এখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং এর মাধ্যমে প্রযুক্তি, মূলধন, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়। তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামোর একটি বড় অংশ যখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বৃহৎ বেসরকারি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন বাজার প্রতিযোগিতা, গ্রাহকস্বার্থ ও নিয়ন্ত্রক নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

দেড় দশকে ছোট সেবা থেকে বিশাল ডিজিটাল সাম্রাজ্য

বিকাশ ২০১০ সালে কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের পর ২০১১ সালে এমএফএস কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে মূলত মোবাইলের মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাঠানোর সহজ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সেবার পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।

এখন বিকাশ শুধু টাকা পাঠানো বা ক্যাশ-আউটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্ল্যাটফর্মে রয়েছে

➡️ ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট;

➡️ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে টাকা স্থানান্তর;

➡️ মার্চেন্ট পেমেন্ট;

➡️ বিল পরিশোধ;

➡️ রেমিট্যান্স গ্রহণ;

➡️ সঞ্চয় ও ডিপিএস;

ডিজিটাল ঋণ;

বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সেবা।

প্রদত্ত ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিকাশের আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা প্রায় ৬৬১ কোটি টাকা।
মুনাফা বৃদ্ধির চিত্রটিও উল্লেখযোগ্য। ২০২২ সালে নিট মুনাফা যেখানে ছিল প্রায় ১৭ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় প্রায় ৯৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে মুনাফা আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১৬ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালে তা প্রায় ৬৬১ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মুনাফায় বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে।

প্রদত্ত আরেক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিকাশের আয় প্রথমবার ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায় এবং নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৩১৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসেই মুনাফা প্রায় ৫০৫ কোটি টাকাতে পৌঁছেছিল, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩১ শতাংশ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ের হিসাবের পদ্ধতি ও প্রতিবেদনকাল আলাদা হওয়ায় এসব পরিসংখ্যান তুলনা করার সময় সময়সীমা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তবে সামগ্রিক প্রবণতা স্পষ্ট বিকাশের ব্যবসা ও মুনাফার পরিধি দ্রুত বড় হয়েছে।

কোটি গ্রাহক, লাখো এজেন্ট ও মার্চেন্ট

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বিকাশের ভেরিফায়েড নিবন্ধিত গ্রাহক ছিল প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে শেষ তিন মাসে সক্রিয়ভাবে লেনদেন করেছেন প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহক।

প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্কে রয়েছে সাড়ে ৩ লাখের বেশি এজেন্ট পয়েন্ট এবং প্রায় ১০ লাখ মার্চেন্ট। এই বিশাল নেটওয়ার্কই বিকাশকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। অনেক মানুষের কাছে ‘মোবাইলে টাকা’ বললেই প্রথম যে নামটি মনে আসে, সেটি বিকাশ।

এই জায়গাটিই অর্থনীতির দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যখন কোটি কোটি গ্রাহক, লাখ লাখ এজেন্ট ও বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটি শুধু একটি অ্যাপ থাকে না; ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামোয় পরিণত হয়।

প্রবাসী রেমিট্যান্সে বিকাশের ভূমিকা

প্রবাসী বাংলাদেশিরা বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ১৩৫টি আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অপারেটরের মাধ্যমে বিকাশ অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব রেমিট্যান্সের সেটেলমেন্ট হচ্ছে দেশের ২৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে। অর্থাৎ বিদেশে থাকা একজন বাংলাদেশি বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর পর তা দ্রুত তার পরিবারের সদস্যের বিকাশ ওয়ালেটে পৌঁছাতে পারে।

বৈধ চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজনপ্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্সের মূল অর্থ বিকাশের আয় নয়। অর্থটি মূলত প্রাপকের। ব্যাংকিং ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অর্থ দেশে আসে এবং মোবাইল ওয়ালেটে পৌঁছায়।

তবে বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ একটি প্ল্যাটফর্মের গ্রাহকসংখ্যা, লেনদেনের পরিমাণ এবং ব্যবসায়িক পরিধি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই রেমিট্যান্স ও এমএফএস ব্যবসার সম্পর্ক অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

কেন টাকা ঢুকে আবার নগদে বেরিয়ে যায়?

বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্টের বড় একটি সমস্যা হলো মানুষের হাতে ডিজিটাল টাকা পৌঁছালেও সেই টাকা খরচ করার মতো যথেষ্ট ডিজিটাল অবকাঠামো সব জায়গায় এখনো তৈরি হয়নি।

দেশের বহু দোকানে নগদের ব্যবহার এখনো ব্যাপক। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে ক্যাশ অন ডেলিভারি জনপ্রিয়। ফলে কোনো পরিবারের সদস্যের মোবাইল ওয়ালেটে টাকা পৌঁছানোর পর সেটি দিয়ে সরাসরি পণ্য বা সেবা কেনার সুযোগ সীমিত হলে শেষ পর্যন্ত টাকা নগদে তুলতে হয়।

আর নগদে তোলার অর্থ হলো ক্যাশ-আউট চার্জ।

এভাবে একটি চক্র তৈরি হয়—

ডিজিটাল পেমেন্ট কম → মানুষ নগদে টাকা তোলে → নগদের ব্যবহার বাড়ে → ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের তাগিদ কমে → আবার মানুষ নগদ নির্ভর থাকে।

এই চক্র ভাঙতে হলে শুধু মোবাইল ওয়ালেটের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; দোকান, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা, অনলাইন কেনাকাটা এবং সরকারি-বেসরকারি সেবায় ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করতে হবে।

২৫ হাজার টাকা তুলতে কত খরচ?

প্রদত্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্যাশ-আউট ব্যয়ের সঙ্গে পাকিস্তান ও মিয়ানমারের তুলনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, একই ধরনের লেনদেনে সেখানে খরচ তুলনামূলক কম। ভারতের ক্ষেত্রে একই ধরনের ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহক বা ব্যবসায়ীর ওপর কোনো ফি না থাকার মডেলকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে মূল বিষয় কেবল কোন দেশে কত টাকা চার্জ নেওয়া হয় তা নয়; বরং একটি দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো কীভাবে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ডিজিটাল টাকা বারবার নগদে রূপান্তর করার প্রয়োজন পড়ে না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যদি ডিজিটাল অর্থ সরাসরি দোকান, পরিবহন, বিল, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবায় ব্যবহার করা যায়, তাহলে ক্যাশ-আউটের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং গ্রাহকের মোট লেনদেন ব্যয়ও কমতে পারে।

ভারত কীভাবে ইউপিআই মডেল তৈরি করল?

ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক উদাহরণ।

ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বিপ্লবকে মোটামুটি তিনটি স্তরে দেখা যায়।

প্রথম স্তরঃ ব্যাংকিং অন্তর্ভুক্তি
জনধন কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ব্যাংক হিসাবের আওতায় আনা হয়। কোটি কোটি মানুষ ব্যাংক হিসাব পায়, যার ফলে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ভিত্তি তৈরি হয়।

দ্বিতীয় স্তরঃ সংযোগ
এই ব্যাংক হিসাবগুলোর মধ্যে দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের জন্য চালু হয় UPI বা Unified Payments Interface। এর মালিক কোনো একক বেসরকারি কোম্পানি নয়; এর অবকাঠামো পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্যাংকগুলোর মালিকানাধীন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান NPCI।

ফলে বা -এর মতো অ্যাপগুলো মূলত সেই অবকাঠামোর ওপর চলা ইন্টারফেস বা সেবা প্রদানকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থ তাদের নিজস্ব ওয়ালেটে আটকে থাকার প্রয়োজন পড়ে না; ব্যাংক হিসাবগুলোর মধ্যেই লেনদেন সম্পন্ন হতে পারে।

তৃতীয় স্তরঃ কম বা শূন্য ফি
ভারতে নীতিগতভাবে UPI ব্যবহারে গ্রাহক ও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীর ওপর লেনদেন ফি না রাখার ব্যবস্থা ডিজিটাল পেমেন্টকে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করতে সহায়তা করেছে।

ফলাফলও বিস্ময়কর। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে UPI-এর মাধ্যমে প্রায় ১৭২ বিলিয়ন লেনদেন হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এখানকার শিক্ষাটি হলো—শুধু অ্যাপ তৈরি করলেই ডিজিটাল অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না। ব্যাংক, ওয়ালেট ও বিভিন্ন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মকে একটি উন্মুক্ত, আন্তঃসংযুক্ত ও কম খরচের অবকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হয়।

এক ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে টাকা পাঠানোর দেয়াল

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন এমএফএস প্ল্যাটফর্ম নিজেদের পৃথক পরিবেশে পরিচালিত হয়েছে। ফলে একটি ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে সরাসরি অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ সীমিত ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা বা interoperability চালুর উদ্যোগ নিলেও বাস্তবায়নে নানা জটিলতা দেখা দেয়।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরের উদ্যোগে জাতীয় পেমেন্ট সুইচের মাধ্যমে ব্যাংক ও ওয়ালেটের মধ্যে সরাসরি অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু উদ্বোধনের সময় দেশের শীর্ষ দুই ওয়ালেট বিকাশ ও নগদ একসঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিল না। একজন শেষ মুহূর্তে সময় চেয়েছিল এবং অন্যটির লাইসেন্স-সংক্রান্ত বিষয় তখনও অসম্পূর্ণ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে অস্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন বলে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

নতুন লক্ষ্য হিসেবে ২০২৭ সালের জুলাইকে সামনে রাখা হয়েছে ততদিনের মধ্যে সব ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত চ্যানেলে আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আন্তঃসংযোগ কার্যকর হলে গ্রাহকের সামনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হবে কোনো একটি নির্দিষ্ট ওয়ালেটে আটকে না থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্ল্যাটফর্মে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ বাড়বে।

বিকাশের বাইরে আর্থিক সেবার বিস্তার

বিকাশের প্রভাব শুধু টাকা পাঠানো ও ক্যাশ-আউটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর অ্যাপ ব্যবহার করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেবা নেওয়া যাচ্ছে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করে ৬০ লাখের বেশি সঞ্চয়ী বা ডিপিএস হিসাব খোলা হয়েছে।

একইভাবে একটি ব্যাংকের মাধ্যমে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ডিজিটাল ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে বিকাশকে এখন শুধু মোবাইল ওয়ালেট হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এটি ধীরে ধীরে ব্যাংক, ঋণ, সঞ্চয়, পেমেন্ট ও রেমিট্যান্স বিভিন্ন আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

তাহলে কি বাংলাদেশের মানুষ ‘বিকাশের কাছে জিম্মি’?

এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি প্রশ্নটিকে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক বলাও ঠিক হবে না।

কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকসংখ্যা বড় হওয়া নিজেই বাজার একচেটিয়া হওয়ার প্রমাণ নয়। বিকাশের পাশাপাশি নগদ, রকেটসহ অন্যান্য এমএফএস প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থাও রয়েছে।

আসল প্রশ্ন হলো গ্রাহকের সামনে কার্যকর বিকল্প কতটা আছে এবং সেই বিকল্পে যাওয়ার খরচ কতটা কম?

একজন গ্রাহক যদি কোনো একটি প্ল্যাটফর্মে তার টাকা রাখেন, দোকানদার যদি একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন, পরিবার যদি একই প্ল্যাটফর্মে টাকা নেয় এবং আশপাশের সব এজেন্টও একই নেটওয়ার্কের হয়, তাহলে অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যাওয়া বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিতে এটিকে নেটওয়ার্ক ইফেক্ট বলা যায়। যত বেশি মানুষ একটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, অন্যদের জন্যও সেই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার প্রণোদনা তত বাড়ে। এতে প্রতিষ্ঠানটির শক্তি আরও বাড়তে পারে।

তাই বাজারের স্বাস্থ্য নির্ভর করবে শুধু কতগুলো কোম্পানি লাইসেন্স পেয়েছে তার ওপর নয়; বরং একজন গ্রাহক বাস্তবে কত সহজে এবং কম খরচে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্যটিতে যেতে পারেন, সেটির ওপর।

একক প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি

বিকাশের মতো বড় কোনো প্ল্যাটফর্মের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচকও হতে পারে। এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়েছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা বহু মানুষকে ডিজিটাল আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং দ্রুত লেনদেনের সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে কোনো একটি প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে কিছু ঝুঁকিও সামনে আসে।

প্রথমতঃ প্রযুক্তিগত ঝুঁকি
সার্ভার সমস্যা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, সাইবার হামলা বা দীর্ঘ সময়ের সেবা বিঘ্নিত হলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক সমস্যায় পড়তে পারেন।

দ্বিতীয়তঃ প্রতিযোগিতার ঝুঁকি
একটি প্ল্যাটফর্মের গ্রাহক ও মার্চেন্ট সংখ্যা অতিরিক্ত বড় হয়ে গেলে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজারে সমানভাবে বিস্তার লাভ করা কঠিন হতে পারে।

তৃতীয়তঃ লেনদেনের খরচ
ক্যাশ-আউটসহ বিভিন্ন সেবার চার্জ গ্রাহকের ওপর কতটা চাপ তৈরি করছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

চতুর্থতঃ ডেটা সুরক্ষা
কোটি কোটি মানুষের আর্থিক লেনদেনের তথ্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাহিত হচ্ছে। এই তথ্যের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, সংরক্ষণ এবং কোন তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা যাবে এগুলো আগামী দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আদালতের প্রশ্নও এখন সামনে

ডিজিটাল লেনদেনের চার্জ নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু অর্থনীতিবিদ, গ্রাহক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্ট বিকাশ, রকেট ও নগদের বাড়তি সার্ভিস চার্জ কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না এ মর্মে রুল জারি করেছে।

একই সঙ্গে আলাদা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস আইন প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সে প্রশ্নও তোলা হয়েছে।

অর্থসচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চার সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ ক্যাশ-আউট ও অন্যান্য সার্ভিস চার্জের যৌক্তিকতা এখন কেবল বাজারের বিষয় নয়; আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আলোচনাতেও প্রবেশ করেছে।

বিকাশের সাফল্য কি তাহলে সমস্যা?

না বিকাশের বড় হয়ে ওঠাকে নিজে থেকে সমস্যা বলা যায় না।

বরং বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন, সেখানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিস্তার একটি বড় পরিবর্তন। একজন কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের পরিবারের সদস্য ব্যাংকের শাখায় না গিয়েও টাকা গ্রহণ ও পাঠাতে পারছেন এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

বিকাশের মতো দেশীয়ভাবে গড়ে ওঠা একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করেছে এবং কোটি মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে এনেছে এটিও বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতার প্রমাণ।

সমস্যা শুরু হতে পারে তখন, যখন একটি প্রতিষ্ঠান এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে গ্রাহকের কাছে কার্যকর বিকল্প থাকে না; অথবা একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্যটিতে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত কিংবা নীতিগত বাধা তৈরি হয়; কিংবা লেনদেনের খরচ কমানোর প্রতিযোগিতামূলক চাপ দুর্বল হয়ে যায়।

প্রশ্নটি বিকাশকে নিয়ে নয়, পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ে

তাই বিতর্কটি কেবল ‘বিকাশ ভালো না খারাপ’ এভাবে দেখলে সমস্যাটির গভীরে যাওয়া যাবে না।

মূল প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা কি এমনভাবে তৈরি হচ্ছে, যেখানে গ্রাহকই বাজারের কেন্দ্রবিন্দু?

একজন গ্রাহক যেন,

▶️ কম খরচে টাকা পাঠাতে পারেন;

▶️ সহজে টাকা গ্রহণ করতে পারেন;

▶️ প্রয়োজন হলে নগদ তুলতে পারেন;

▶️ দোকানে সরাসরি ডিজিটাল অর্থ ব্যয় করতে পারেন;

▶️ এক ব্যাংক বা ওয়ালেট থেকে অন্য ব্যাংক বা ওয়ালেটে সহজে টাকা পাঠাতে পারেন;

▶️ নিজের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন;

▶️ কোনো একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে নির্ভরশীল না থাকেন এটাই হওয়া উচিত ডিজিটাল অর্থনীতির মূল লক্ষ্য।

প্রবাসীর টাকা কার জন্য?

প্রবাসী বাংলাদেশি যে টাকা পাঠান, সেটি মূলত তার পরিবারের জন্য। রাষ্ট্র সেই বৈদেশিক মুদ্রাকে বৈধ চ্যানেলে দেশে আনতে উৎসাহ দিতে প্রণোদনা দেয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেই অর্থের প্রবাহ পরিচালনা করে। আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সেই অর্থকে দ্রুত পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

এই পুরো ব্যবস্থায় প্রযুক্তির অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই প্রবাসীর পাঠানো অর্থ পরিবারের হাতে পৌঁছানোর শেষ ধাপে মোট খরচ কত? সেই খরচ কমানোর সুযোগ আছে কি না? মানুষ কেন টাকা পাওয়ার পর আবার সেটিকে নগদে রূপান্তর করতে বাধ্য হচ্ছে? কেন ডিজিটাল অর্থ সরাসরি দোকান, বাজার ও সেবায় ব্যয় করা যাচ্ছে না? কেন একটি ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তর এখনো সম্পূর্ণ বাধাহীন নয়?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই বোঝা যাবে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি কতটা পরিণত হয়েছে।

সামনে করণীয় কী?

বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, এমএফএস খাতে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু একাধিক কোম্পানি থাকলেই প্রতিযোগিতা হয় না; তাদের মধ্যে সমান সুযোগ ও গ্রাহকের সহজে বিকল্প বেছে নেওয়ার পরিবেশ থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা দ্রুত কার্যকর করতে হবে। ব্যাংক, এমএফএস ও অন্যান্য পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সহজে টাকা স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করা গেলে গ্রাহক একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকবেন না।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়াতে হবে। শুধু টাকা পাঠানো ও ক্যাশ-আউট নয়; দোকান, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিল, সরকারি ফি এবং অনলাইন বাণিজ্যে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, লেনদেনের খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা যদি শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করে, তাহলে ডিজিটাল রূপান্তরের মূল উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।

পঞ্চমত , ডেটা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে হবে। মানুষের আর্থিক লেনদেনের তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হবে তার বিষয়ে কঠোর নীতি প্রয়োজন।

ষষ্ঠত , নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এমএফএস এখন আর শুধু মোবাইলে টাকা পাঠানোর সেবা নয়; এটি ব্যাংকিং, ঋণ, সঞ্চয়, রেমিট্যান্স ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামো।

শেষ কথাঃ
এক দশকের কিছু বেশি সময়ে বিকাশ একটি মোবাইল মানি ট্রান্সফার সেবা থেকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি গ্রাহক, লাখ লাখ এজেন্ট ও মার্চেন্ট, বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ, সঞ্চয়, ঋণ ও ডিজিটাল পেমেন্ট সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব এখন বাংলাদেশের আর্থিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই সাফল্যকে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। বরং এটি প্রমাণ করে, প্রযুক্তি চাইলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দরজা মানুষের জন্য খুলে দিতে পারে।

কিন্তু একটি বড় প্রতিষ্ঠান সফল হয়েছে বলেই প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না; বরং সেখান থেকেই নতুন প্রশ্ন শুরু হয়।

1️⃣ ডিজিটাল অর্থনীতি কি গ্রাহকের খরচ কমাচ্ছে?

2️⃣ গ্রাহক কি সত্যিই স্বাধীনভাবে প্ল্যাটফর্ম বেছে নিতে পারছেন?

3️⃣ ব্যাংক, এমএফএস ও ফিনটেক কি সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারছে?

4️⃣ ডিজিটাল অর্থ কি সত্যিই ডিজিটালভাবেই খরচ করা যাচ্ছে, নাকি শেষ পর্যন্ত নগদে ফিরে যেতে হচ্ছে?

ভারতের UPI দেখিয়েছে, ব্যাংক ও পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মকে একটি আন্তঃসংযুক্ত অবকাঠামোয় নিয়ে এসে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল লেনদেন কম খরচে করা সম্ভব। বাংলাদেশের জন্যও সেই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

তাই ভবিষ্যতের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘বিকাশ কত বড় হলো’ এটি নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ, সাশ্রয়ী, প্রতিযোগিতামূলক, আন্তঃসংযুক্ত ও গ্রাহকবান্ধব হলো।

প্রবাসীর পাঠানো প্রতিটি টাকা তার পরিবারের কাছে যত দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে পৌঁছাবে, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি তত বেশি সফল হবে।

প্রযুক্তির প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তা মানুষের জীবনকে সহজ করে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাকে বড় করে না।

আরও