×
×
Thursday, 29 October, 2026, 12:18 pm


ভারতের পুঁজিবাজারে বড় চমক: ৭৩০ কোটি ডলারের আইপিও আসছে, বদলে যেতে পারে বিনিয়োগের গতিপথ

জিও প্ল্যাটফর্ম ও এনএসই একসঙ্গে বাজারে আসছে; ডিজিটাল বিপ্লব ও খুচরা বিনিয়োগের নতুন দিগন্তের সূচনা হচ্ছে। ভারতের অর্থনীতির দুই প্রধান স্তম্ভ দেশের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর জিও প্ল্যাটফর্ম এবং শেয়ারবাজারের প্রধান কেন্দ্র ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই) চলতি বছরের শেষ নাগাদ আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আকারে বাজারে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট ৭৩০ কোটি ডলারের এই দুই আইপিও ভারতের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করতে পারে।

গত মাসে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ধনকুবের মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্সের ডিজিটাল শাখা জিও প্ল্যাটফর্ম এবং এনএসই তাদের আইপিওর খসড়া নথি জমা দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডেরিভেটিভ এক্সচেঞ্জ এবং লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ তিন ইকুইটি বাজারের অন্যতম এনএসই-এর এই তালিকাভুক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই জিওর অভিষেকও বিরাট।

শুধু অর্থের অঙ্কই নয়, এই দুই প্রতিষ্ঠান গত এক দশকে ভারতীয়দের জীবনযাপন, ব্যয়, বিনিয়োগ ও লেনদেনের ধরনে আসা মৌলিক পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বাজারবিশ্লেষকদের ধারণা, জিও প্রায় ৪০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করতে পারে, যাতে কোম্পানিটির মূল্যায়ন দাঁড়াতে পারে ১২০ থেকে ১৬০ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে এনএসই তাদের ৬ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার তুলতে পারে, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলার।

ডিজিটাল বিপ্লবের প্রতীক জিও

২০১৬ সালে ভারতের জনাকীর্ণ টেলিকম বাজারে প্রবেশ করে জিও। তখন বাজারে ছিল ১৭টি অপারেটর। জিও প্রায় বিনা মূল্যে ডেটা দিয়ে এক ভয়াবহ মূল্যযুদ্ধ শুরু করে, যা খাতটিকে দ্রুত একীভূত করে কার্যত দুই প্রতিষ্ঠানের দখলে নিয়ে যায়।

এর ফলাফল বিস্ময়কর। এক দশক আগে ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ২০ কোটি। এখন সেই সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি। শুধু জিওর গ্রাহকই ৫২ কোটি ৫০ লাখ। মোবাইল ডেটা ব্যবহারে এখন ভারত বিশ্বে শীর্ষে—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে। জিওর সস্তা ইন্টারনেটই স্মার্টফোন ব্যবহারের গণতন্ত্রায়ণ ঘটিিয়েছে।

তালিকাভুক্তির প্রস্তুতির পাশাপাশি জিও নিজেকে শুধু টেলিকম কোম্পানি হিসেবে নয়, দেশীয় ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এজন্য তারা এনভিডিয়া ও মেটা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। লক্ষ্য, ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা এবং ভারতীয় ভাষাভিত্তিক বড় ভাষা মডেল তৈরি।

এনএসই: খুচরা বিনিয়োগের উত্থানের গল্প

অন্যদিকে এনএসই-এর উত্থান ভারতজুড়ে খুচরা বিনিয়োগে যে রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটেছে, তার প্রতিচ্ছবি। মহামারির সময় লাখ লাখ ছোট বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে আসেন। সস্তা ডেটা ও স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রসারে অনলাইন ট্রেডিং হিসাব ৩ কোটি থেকে বেড়ে ২০ কোটির বেশি হয়েছে।

ভারতের শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন ৪.৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার, এর মূল ভিত্তি হলো এনএসই। বাজারমূল্যের দিক থেকে এটি এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম শেয়ারবাজার। করপোরেট জটিলতায় দীর্ঘদিন আটকে থাকা এনএসই-এর তালিকাভুক্তি এখন ভারতের বাজার অবকাঠামোর পরিপক্বতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্ল্যাটফর্মের প্রতিটি লেনদেন থেকেই আয় করে প্রতিষ্ঠানটি, এবং লেনদেনের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতীয় পরিবারের সঞ্চয় যে মিউচুয়াল ফান্ড ও শেয়ারে স্থানান্তরিত হয়েছে, এনএসই তার প্রতীক।

লেনদেনের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন

জিওর মতোই বদলে গেছে ভারতের অর্থ লেনদেনের ধরন। ২০১৬ সালে চালু হওয়া ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেস (ইউপিআই) প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২৮ বিলিয়ন ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন করেছে।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সাবস্ক্রিপশন নেওয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয়দের মাসিক ডেটা খরচ নীরবে তিন গুণ হয়েছে, গ্রামীণ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় যা তিন গুণ দ্রুত।

চ্যালেঞ্জ ও বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা

যদিও এই দুই আইপিও নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ রয়েছে, তবুও কিছু শঙ্কা কাটছে না। গত এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার আশায় যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক খাতে ঝুঁকেছেন, ফলে ভারতীয় বাজার থেকে শত শত কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে। রুপির দরপতনের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

আবার গত কয়েক বছরে পেটিএম ও এলআইসির মতো আলোচিত আইপিওতে বিনিয়োগ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক ছোট বিনিয়োগকারী। অনেক বড় আইপিও এখন তালিকাভুক্তির চেয়ে কম দামে লেনদেন হচ্ছে।

বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এমকে গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী যতীন সিং সতর্ক করে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত এই আইপিওগুলোর মূল্য নির্ধারণ থেকেই ঠিক হবে, ব্যবসায়িকভাবে সফল কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কতটা মুনাফাজনক হবে। অতিমূল্যায়িত করা হলে ভালো কোম্পানির শেয়ারও মানুষকে হতাশ করতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা একমত যে, জিও এবং এনএসই সম্মিলিতভাবে ভারতের নতুন অর্থনীতির দুই প্রধান স্তম্ভ। তাদের একসঙ্গে বাজারে আসা বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে যদি সঠিক মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বজার থাকে।

[atn_photocard]
আরও