ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল: বেগুন-কাঁকরোলে সেঞ্চুরি
১. প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব: ফসল নষ্ট ও সরবরাহ ব্যাহত
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাত ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা দেশের কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকরা সময়মতো ধান কাটতে না পারায় এবং রোদের অভাবে কাটা ধান পচে যাওয়ায় চলতি বছরের খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, বন্যায় হাওরাঞ্চলে বোরো উৎপাদন ২০ শতাংশ ও জাতীয়ভাবে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা ভবিষ্যতে চালের বাজারকেও চাপে ফেলবে৷
শুধু ধান নয়, সবজি ও মুরগির খামারও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে জমি নিমজ্জিত হওয়ায় কৃষকরা সবজি সংগ্রহ করতে পারছেন না, পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদিত পণ্যও সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। আবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও বিতরণ উভয় ক্ষেত্রেই সংকট তৈরি হয়েছে।
২. বর্তমান বাজার পরিস্থিতি: সবজিতে দামের উর্ধ্বগতি
বাজারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবজির দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। চলতি সপ্তাহের বাজার মে ২০২৬
নিম্নরূপ:
চিকন বেগুন ৮০ টাকা ১০০ টাকা
বড় গোল বেগুন ১৩০ টাকা ১৫০ টাকা
কাঁকরোল ১০০ টাকা ১২০ টাকা
টমেটো ৬০ টাকা ৭০ টাকা
বরবটি ৬০ টাকা ৮০ টাকা
পটোল / ঝিঙে ৬০ টাকা ৭০ টাকা
ঢ্যাঁড়স ৫০ টাকা ৬০ টাকা
কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা ১২০ টাকা
লাউ (প্রতিটি) ৬০ টাকা ৮০ টাকা
কাঁচকলা (হালি) ৪০ টাকা ৫০ টাকা
রাজধানীর বাজারগুলোতে ৬০ টাকার নিচে কোন সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে বেগুন ও কাঁকরোলের কেজি ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম আলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে শসার দাম বেড়েছে ১১১ শতাংশ, কাঁচা পেঁপের দাম ৮৭ শতাংশ বেড়েছে এবং টমেটোর দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে যা বাজারের তীব্র অস্থিরতাই প্রমাণ করে।
৩. প্রোটিনের বাজারেও অস্থিরতা
শুধু সবজি নয়, প্রোটিনজাত খাদ্যেও দাম বাড়ছে। বর্তমান বাজার দর নিম্নরূপ:
পণ্যের নাম বর্তমান মূল্য
ব্রয়লার মুরগি ১৮৫–২০০ টাকা/কেজি
সোনালি মুরগি ৩৩০–৩৮০ টাকা/কেজি
গরুর মাংস ৭৮০–৮০০ টাকা/কেজি
ডিম (হালি) ৪৮ টাকা (সরকারি নির্ধারিত দরে বিক্রি হলেও বাজারে ৪৮–৫০ টাকা)
পাঙাশ মাছ ২২০–২৬০ টাকা
রুই মাছ ৩২০–৩৬০ টাকা
ইলিশ মাছ (হাফ কেজি) ১,৫০০–১,৬০০ টাকা
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ব্রয়লার মুরগির দাম ১৪৫ টাকা বৃহত্তর ও ১৫০ টাকা খুচরা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। ডিমের দাম হালি ৪৮ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার, কিন্তু বাজারে সেই দর বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
৪. নিত্যপণ্যের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
মুদি পণ্যের দামেও প্রভাব পড়েছে। বর্তমান বাজার দর নিম্নরূপ:
· দেশি পেঁয়াজ: ৪০–৪৫ টাকা/কেজি (গত সপ্তাহে ৫ টাকা বেড়েছে)
· চিনি: ১৫০–১৬০ টাকা/কেজি
· মোটা মসুর ডাল: ১২০–১৩০ টাকা/কেজি
· পোলাও চাল: ৮০–১৩০ টাকা/কেজি
· বোতলজাত সয়াবিন তেল: সরবরাহ সংকট সহ ১ লিটার ১৫০–১৭০ টাকা
· আটা: ৬০–৬২ টাকা/কেজি (সরকারি উদ্যোগে কিছুটা কম দরে বিক্রি হলেও বাজারে দর বেশি)
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু বৃষ্টি নয়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য পণ্যের দামে যুক্ত করেছে অতিরিক্ত চাপ। পর্যায়ক্রমে ডিজেল, কেরোসিন ও পেট্রলের দাম বৃদ্ধি পাইকারি ও খুচরা সব পর্যায়েই মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছে।
৫. সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
সবজির চড়া দামে রীতিমতো নাভিশ্বাস সাধারণ ক্রেতাদের। ময়লা পানি মাড়িয়ে বাজারে গিয়েও স্বস্তি মিলছে না। এক বাজার সফরে দেখা যায়, এক কেজি বেগুন কিনতেই ১৪০ টাকা খরচ হচ্ছে, আর পটোলের কেজি চড়ছে ৬০ টাকা। বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় ও দোকানিরা ‘বৃষ্টির অজুহাত’ দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারা।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও টানা বৃষ্টি দুটো কারণ মিলেই বাজারের এ অস্থিরতা। সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে বৃষ্টি কমে এলে দাম কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু ইতোমধ্যে হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তা আগামী কয়েক মাস ধরে খাদ্যপণ্যের দামকে ঊর্ধ্বমুখী রাখার শঙ্কা তৈরি করছে।