বিদেশি ঋণ রেকর্ড ছুঁয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলার
দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ নতুন রেকর্ড গড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ঋণ ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার বেড়ে স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে। এর আগের প্রান্তিকে (সেপ্টেম্বর) এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় (গত বছরের আগস্ট) বিদেশি ঋণ ছিল ১০৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৮ মাসে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই ঋণ বেড়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে সরকারি খাতের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ৯২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ বেড়ে ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই বিদেশি ঋণের চাপ বাড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বড় বড় মেগাপ্রকল্প (পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল) গ্রহণের ফলে ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বছরেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়, যা ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২২ সাল থেকে ডলার সংকট শুরু হয়। ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। সে সময় ডলার সংকট সামাল দিতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বিদেশি ঋণ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হয় এবং রিজার্ভের পতন থামানো সম্ভব হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক উৎস থেকে প্রত্যাশিত ঋণ পাওয়ায় এই স্থিতিশীলতা আসতে সাহায্য করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের জিডিপির তুলনায় বিদেশি ঋণের পরিমাণ এখনো সহনীয় মাত্রায় রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আগে নেওয়া বিদেশি ঋণের সঠিক ব্যবহার না হলে এবং অপচয় চলতে থাকলে তা পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে না। তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বাস্তবে পরিশোধ করতে গেলে চাপ অনুভূত হবে।
অর্থনীতিবিদরা গত কয়েক বছর ধরেই বিদেশি ঋণ গ্রহণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিলেও তা উপেক্ষা করেই আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশি ঋণ বাড়িয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।