অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় সমানুপাতিক হারে ভালো না থাকার কারণ
সমানুপাতিক হারে ভালো না থাকা বা আনুপাতিক হারে উন্নতি না করার অর্থ হলো, আয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ বা জীবনযাত্রার মান অন্যান্য খাত বা মানুষের তুলনায় একই হারে বা অনুপাতে বাড়ছে না। দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনে এর পেছনে বেশ কিছু বাস্তব কারণ কাজ করে। নিচে সেগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. আয় ও মূল্যস্ফীতির অসমতা (মূল্যস্ফীতি)
সবচেয়ে বড় কারণ হলো মূল্যস্ফীতি। আপনার বেতন বা আয় যদি শতকরা ৫ ভাগ বাড়ে, কিন্তু বাজারে জিনিসপত্রের দাম যদি বাড়ে ৮-১০ ভাগ হারে, তাহলে আপনার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, আপনার হাতে টাকা থাকলেও তা দিয়ে আগের মতো জিনিস কেনা সম্ভব হয় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (যেমন: খাদ্য, পরিবহন, চিকিৎসা) দাম যখন দ্রুত বাড়ে, তখন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় এবং আয়ের অনুপাতে ভালো থাকার অনুভূতি কমে যায়।
২. আয়ের বৈষম্য
একটি দেশের গড় আয় বা জিডিপি বাড়লেও তা সবার মাঝে সমানভাবে বিতরণ নাও হতে পারে। উচ্চ আয়ের মানুষ ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ দখল করে নেয়। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের অংশ তুলনামূলকভাবে কমে যায় বা স্থির থাকে। এই বৈষম্যের কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল থেকে তারা বঞ্চিত হন এবং “সমানুপাতিক হারে ভালো থাকার” সুযোগ হারান।
৩. কর্মসংস্থানের ধরন ও অনানুষ্ঠানিক খাত
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে (দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক) কাজ করেন। এই খাতে আয় স্থিতিশীল নয়, সামাজিক নিরাপত্তা (পেনশন, চিকিৎসা ভাতা) নেই এবং আইনগত সুরক্ষাও কম। অন্যদিকে, নিয়মিত বেতনভোগী চাকরিজীবীদের আয় তুলনামূলকভাবে নিয়মিত ও সুরক্ষিত। এই কাঠামোগত পার্থক্যের কারণে অনেক মানুষ অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না।
৪. দক্ষতা ও প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। নতুন প্রযুক্তি আসছে, পুরোনো পেশা বিলুপ্ত হচ্ছে। একজন ব্যক্তি যদি তার দক্ষতা (স্কিল) আপডেট না করতে পারেন, তাহলে তিনি উচ্চ বেতনের চাকরি বা ব্যবসার সুযোগ হারান। অন্যদিকে, যারা প্রযুক্তি ও ভাষা দক্ষতায় এগিয়ে, তারা অর্থনৈতিক উন্নতির সুযোগ অনেক বেশি হারে নিতে পারেন। ফলে ব্যবধান বাড়তে থাকে।
৫. সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা
অনেক দেশে পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা বলয় (বেকার ভাতা, বৃদ্ধ বয়সের ভাতা, স্বাস্থ্য বীমা) থাকে না। ফলে একটি দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা চাকরি হারালে পরিবারের আর্থিক ভিত হুমকির মুখে পড়ে। এই অনিশ্চয়তা মানুষকে সমানুপাতিক হারে উন্নতি করা থেকে পিছিয়ে রাখে, কারণ তাদের আয়ের একটা বড় অংশ জরুরি সঞ্চয় হিসেবে রাখতে হয়, যা বিনিয়োগ বা উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব হয় না।
৬. খেলাপি ঋণ ও ঋণের বোঝা
প্রাত্যহিক জীবনে অনেকেই বাড়ি কেনা, গাড়ি কেনা বা ব্যবসার জন্য ঋণ করেন। কিন্তু সুদের হার যদি বেশি হয় বা আয় অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যায়, তাহলে ঋণ পরিশোধের বোঝা বাড়ে। ফলে হাতে নগদ টাকার পরিমাণ কমে যায় এবং জীবনযাত্রার মান আগের মতো বাড়তে পারে না। কিস্তির টাকা বাদ দিয়ে যা থাকে, তা দিয়ে শুধু নিত্যপ্রয়োজন মেটে, কিন্তু উন্নতি হয় না।
৭. আর্থিক সাক্ষরতার অভাব
অনেক মানুষ জানেন না কিভাবে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে হয়, শেয়ারবাজার বা মিউচুয়াল ফান্ডের সুবিধা নিতে হয়, বা কর সাশ্রয়ী বিনিয়োগ করতে হয়। ফলে তাদের সঞ্চিত টাকা সঠিক খাতে কাজ করে না। যাদের আর্থিক জ্ঞান বেশি, তারা তাদের টাকা দিয়ে আরও টাকা উপার্জন করতে পারেন। যাদের এই জ্ঞান নেই, তারা শুধু সঞ্চয় করেও মূল্যস্ফীতির কাছে হেরে যান।
৮. জনসংখ্যার চাপ
পরিবারের আকার বড় হলে আয়ের একটি বড় অংশ মাথাপিছু ব্যয়ে চলে যায়। একটি নির্দিষ্ট আয় দিয়ে যত মানুষকে ভরণপোষণ করতে হয়, প্রতিজনের জন্য বরাদ্দ তত কমে যায়। ফলে সামগ্রিকভাবে পরিবারের আয় বাড়লেও, প্রতিটি সদস্যের জন্য “ভালো থাকার” পরিমাণ আনুপাতিক হারে বাড়ে না।
পরিশেষে বলা যায়:
সমানুপাতিক হারে ভালো না থাকার অর্থ এই নয় যে আপনি আর্থিকভাবে এগোচ্ছেন না; বরং অর্থনীতির সামগ্রিক চাকা যত দ্রুত ঘুরছে, আপনার ব্যক্তিগত অর্থনীতির চাকা তার চেয়ে ধীরে ঘুরছে। এর মূল প্রতিকার হলো দক্ষতা উন্নয়ন, সচেতন বিনিয়োগ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনা করা, যাতে মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্যের মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখা যায়।