আদর্শের সন্ধানে: যখন রাসূলগণই হন পথপ্রদর্শক, তখন আমরা কার অনুসরণ করি?
আমরা মুসলিম হিসাবে বিশ্বাস করি যে, মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাদের জীবন আমাদের জন্য চিরন্তন আদর্শ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায় আমাদের জন্য রাসূলগণের চরিত্র ও আচরণকে সর্বোত্তম নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমরা কি সত্যিই সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করেছি, নাকি শুধু নামের লেবাসে আবৃত হয়ে ভিন্ন পথে হাঁটছি? এই প্রতিবেদনে কুরআনের আলোকে রাসূলগণের প্রদর্শিত আদর্শ ও আমাদের বর্তমান অবস্থানের মধ্যে ব্যবধানটি তুলে ধরা হবে।
কুরআনে রাসূলগণের আদর্শের স্বীকৃতি
মহান আল্লাহ রাসূলদেরকে শুধু পাঠাননি, বরং তাদের চরিত্র ও আচরণকে মানবজাতির জন্য ‘উত্তম আদর্শ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন।
· রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর জন্য সর্বোত্তম আদর্শ:
আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আছে আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ, তার জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।” (সূরা আল-আহযাব: ২১)
এই আয়াতটি আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি। রাসূল (সা.)-এর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র—ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্র পরিচালনা—সবকিছুই জন্য অনুসরণীয়। তার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, সহানুভূতি ও ন্যায়পরায়ণতা।
· মূসা (সা.)-কে শিক্ষা: নম্রতা ও শিষ্টাচার:
আপনি যেমনটি উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ মুসা (সা.)-কে সবচেয়ে বড় অত্যাচারী ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময়ও শিষ্টাচার শিখিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন,
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ
> “অতএব তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।” (সূরা ত্বা-হা: ৪৪)
এই নির্দেশনা প্রমাণ করে যে, নবীদের আদর্শের একটি প্রধান অংশ হলো শিষ্টাচার ও নম্রতা। যেখানে ফেরাউনের মতো সীমালঙ্ঘনকারীর সাথেও নম্রভাবে কথা বলার নির্দেশ, সেখানে একজন সাধারণ মুসলিমের জীবনাচার কেমন হওয়া উচিত, তা সহজেই অনুমেয়।
· অন্যান্য নবীগণের আদর্শ:
কুরআনে শুধু মুহাম্মদ (সা.) বা মুসা (সা.)-ই নন, ইবরাহিম (সা.), নুহ (সা.), ঈসা (সা.) সহ সকল নবীকে তাদের ধৈর্য, ত্যাগ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য প্রশংসিত করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন তাদের যুগের জন্য উত্তম আদর্শ।
বর্তমান বাস্তবতা: আমরা কার আদর্শ গ্রহণ করছি?
উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহর কিতাবে নবী-রাসূলগণই আমাদের একমাত্র ও শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক। কিন্তু বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে একটি বিভ্রান্তিকর চিত্র ফুটে ওঠে:
1. লেবাসের প্রতি গুরুত্ব, চরিত্রের প্রতি অবহেলা: আমরা অনেক সময় নিজেদেরকে মুসলিম পরিচয়ে ভূষিত করলেও, আমাদের চরিত্র, আচরণ ও লেনদেনে ইসলামী মূল্যবোধের ছাপ অস্পষ্ট। রাসূল (সা.)-এর অনুসরণ বলতে আমরা প্রায়ই পোশাক-আশাক, দাড়ি-টুপির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি। অথচ তাঁর চরিত্রের মূল ভিত্তি ছিল সততা, বিশ্বস্ততা, ক্ষমাশীলতা ও ইনসাফ—এই বিষয়গুলো আমরা অবহেলা করি।
2. অন্ধ অনুসরণের সংস্কৃতি: ধীরে ধীরে আমরা নবী-রাসূলের পরিবর্তে বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মতবাদের অন্ধ অনুসরণ শুরু করি। তাদের কথা ও কাজকে আমরা অন্ধভাবে মেনে নেই, এমনকি যদি তা কুরআন এর স্পষ্ট নির্দেশনার বিপরীতও হয়।
3. পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় কারা? প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের চিন্তা-চেতনা, জীবনযাপন ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলছি আল্লাহর দেখানো পথে? নাকি আমরা পাশ্চাত্যের ভোগবাদী দর্শন, পূর্বের বস্তুবাদী মতবাদ, অথবা নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করা গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের পথে হাঁটছি? আমাদের পথপ্রদর্শক এখন আর নবী ও রাসুল নন, বরং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, প্রভাবশালী নেতা, অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তারকারা হয়ে উঠছেন।
কীভাবে উত্তম আদর্শের অধিকারী হওয়া যায়?
আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। এখন দায়িত্ব আমাদের। “লেবাসে নয়, চরিত্রে উন্নত আদর্শের অধিকারী” হওয়ার জন্য আমাদের করণীয়:
1. প্রত্যাবর্তন: আমাদেরকে ফিরে আসতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত শিক্ষার দিকে। শুধু নামাজ-রোজা পালন করাই যথেষ্ট নয়, রাসূল (সা.)-এর চরিত্রকে নিজেদের জীবনের অংশ বানাতে হবে।
2. বিচক্ষণতা: আমাদের বুঝতে হবে কে আমাদের প্রকৃত পথপ্রদর্শক। যেকোনো ব্যক্তি বা মতবাদকে অনুসরণ করার আগে তাকে কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে যাচাই করতে হবে।
3. চরিত্র গঠন: নিজেদের চরিত্র গঠনে মনোযোগ দিতে হবে। সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা, দয়া ও নম্রতা—এই গুণগুলো অর্জনের মাধ্যমে আমরা প্রকৃত অর্থে রাসূল (সা.)-এর আদর্শের অনুসারী হতে পারি।
আল্লাহ আমাদেরকে নবী-রাসূলগণের প্রকৃত আদর্শ বুঝার ও সেই অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমাদের পথপ্রদর্শক হোন তাঁরা, আর আমাদের জীবনের লক্ষ্য হোক তাঁদের দেখানো পথে চলা। আমিন।