×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 7:48 am


দূষণে বিপর্যস্ত ধোলাইপাড়–শনিরআখড়া–জুরাইনের খাল

রাজধানীর ধোলাইপাড় থেকে শুরু হয়ে শনিরআখড়া হয়ে জুরাইনের দিকে প্রবাহিত খালটির বর্তমান অবস্থা নগর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খালটি ময়লা-আবর্জনা ও দূষিত পানিতে ভরে থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও পানির ওপর ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন ও নানা ধরনের বর্জ্য, কোথাও আবার জমে থাকা নোংরা পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছে আশপাশের ভবন ও স্থাপনা। একসময় পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও যথাযথ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি এখন এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় পরিবেশের এই চিত্র শুধু একটি খালের দুরবস্থার কথা বলে না; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য নিষ্কাশন, জনস্বাস্থ্য এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। খালটি দীর্ঘদিন ধরে অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। তাই বিষয়টিকে কেবল পরিচ্ছন্নতার সমস্যা হিসেবে না দেখে জনস্বার্থ ও পরিবেশ সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দূষিত খাল, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ

খালের পানিতে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা এবং পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়া নগর পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পানি স্থির হয়ে থাকলে এবং আশপাশে পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের সামগ্রী কিংবা অন্যান্য বৃষ্টির পানি জমার উপযোগী স্থান তৈরি হলে মশার প্রজননের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে এলাকায় ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি।

তবে ডেঙ্গু মশা শুধু দূষিত খালেই জন্মায় না। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, পানির পাত্র এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে খাল পরিষ্কারের পাশাপাশি আশপাশের বাড়িঘর, দোকানপাট, নির্মাণস্থল ও খোলা জায়গায় জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি—এই সমন্বিত উদ্যোগই ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে, দূষিত পানি থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি, নোংরা পরিবেশের বিস্তার এবং ক্ষতিকর বর্জ্যের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পানিতে কী ধরনের দূষক রয়েছে, তা পরীক্ষা ছাড়া নির্দিষ্ট রোগের কারণ হিসেবে খালটিকে চিহ্নিত করা যায় না। তবু পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে খালটির অবস্থা দ্রুত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

পানি নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের গুরুত্ব

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে খাল ও প্রাকৃতিক জলপথের গুরুত্ব অপরিসীম। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা কমানো এবং নগরের পানি প্রবাহ সচল রাখতে এসব জলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু খালের তলদেশে পলি জমা, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যের স্তূপ, পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা এবং অবৈধ দখল থাকলে এর কার্যকারিতা কমে যায়।

ধোলাইপাড় থেকে শনিরআখড়া হয়ে জুরাইনের দিকে বিস্তৃত এই খালটির ক্ষেত্রেও পানিপ্রবাহ, তলদেশের অবস্থা, বর্জ্য জমার মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট নিষ্কাশনব্যবস্থা সরেজমিনে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোথায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কোথায় বর্জ্য জমছে এবং কোথায় সংস্কার করা জরুরি এসব বিষয় চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

শুধু খালের দৃশ্যমান অংশ থেকে ময়লা সরিয়ে ফেললেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খালের সঙ্গে যুক্ত নালা, সংযোগস্থল ও পানি নিষ্কাশনের পথগুলোও পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি আশপাশের বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য যাতে সরাসরি খালে না পড়ে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

এক দিনের পরিচ্ছন্নতা নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সংস্কার

খালটির বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনে স্বল্পমেয়াদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রথম কাজ হবে খালের পুরো অংশ সরেজমিনে পরিদর্শন করে দূষণের উৎস, পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ চিহ্নিত করা।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খাল থেকে জমে থাকা আবর্জনা ও পলি অপসারণ, প্রয়োজন অনুযায়ী তলদেশ পরিষ্কার, পানিপ্রবাহের পথ সচল করা এবং খালের দুই পাশের অবস্থা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে সংস্কারের সময় খালের স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ও আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা বিবেচনায় রাখা জরুরি। খালের পানি ও তলদেশে দূষণের মাত্রা নিরূপণে প্রয়োজনে পরিবেশগত পরীক্ষাও করা উচিত।

এ ছাড়া খালের পাশে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার সুযোগ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করে নজরদারি জোরদার করা দরকার। খালের পানি ও পরিবেশের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দূষণ আবারও বাড়ছে কি না, তা যাচাই করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একবার পরিষ্কার করার পর খালটির দায়িত্ব যেন অবহেলিত না থাকে। নিয়মিত তদারকি, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই আগের পরিস্থিতি ফিরে আসতে পারে।

পরিবেশবান্ধব ও বসবাসযোগ্য নগর গড়ার দাবি

একটি খাল কেবল পানি প্রবাহের পথ নয়; এটি নগরের পরিবেশগত ব্যবস্থারও অংশ। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে খাল ও জলপথ নগরের পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করতে পারে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, বর্জ্য ফেলার স্থানে পরিণত হলে তা নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি পরিবেশগত সমস্যা আরও বাড়িয়ে তোলে।

ধোলাইপাড়, শনিরআখড়া ও জুরাইন এলাকার মানুষের জন্য খালটির পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খালের দুই পাশে নিরাপদ চলাচলের উপযোগী পরিবেশ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পানিপ্রবাহের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং দূষণ প্রতিরোধের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এলাকাটিকে আরও পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।

তবে খাল সংস্কার করতে গিয়ে শুধু কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণ বা সৌন্দর্যবর্ধনের দিকে নজর দিলেই চলবে না। পানিপ্রবাহ সচল রাখা, দূষণের উৎস বন্ধ করা এবং পরিবেশের ক্ষতি কমানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। খালের প্রকৃতি ও বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণ করাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে

খালটির পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সেবা সংস্থাগুলোর। তবে নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন। সরকারি অর্থে খাল পরিষ্কার করা হলেও মানুষ যদি আবার সেখানে পলিথিন, প্লাস্টিক, খাবারের উচ্ছিষ্ট কিংবা অন্যান্য বর্জ্য ফেলে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

এ জন্য এলাকার বাসিন্দা, দোকানদার, ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। খালে ময়লা না ফেলা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য জমা রাখা, বর্জ্য সংগ্রহকারীদের হাতে তা তুলে দেওয়া এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে খাল দখল, অবৈধভাবে বর্জ্য ফেলা কিংবা পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টির মতো ঘটনা দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। বিদ্যালয়, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সুরক্ষাবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

নাগরিকদের মনে রাখতে হবে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু সরকারের কাছ থেকে পাওয়ার বিষয় নয়; এটি রক্ষা করার দায়িত্বও সবার। নিজের বাড়ি ও দোকানের আশপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি এলাকার খাল, নালা ও জলপথ রক্ষায় সচেতন ভূমিকা পালন করা প্রত্যেকের সামাজিক দায়িত্ব।

দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান

ধোলাইপাড় থেকে শনিরআখড়া হয়ে জুরাইনের দিকে বিস্তৃত খালটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো জরুরি। খালটির সীমানা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নির্ধারণ, দূষণের উৎস শনাক্তকরণ, বর্জ্য অপসারণ, পানিপ্রবাহ সচল করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।

পাশাপাশি এলাকাবাসীর অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংস্কারকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা উচিত। প্রয়োজনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যকর্মী এবং নাগরিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

একটি পরিচ্ছন্ন খাল মানে শুধু চোখে দেখার মতো সুন্দর পরিবেশ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পানি নিষ্কাশন, মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য দূষণ প্রতিরোধ এবং নগরবাসীর সামগ্রিক জীবনমান। তাই খালটির সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণকে বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর নগর পরিবেশ উন্নয়ন উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে খালটিকে আবারও কার্যকর, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশসম্মত জলপথ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়মতো উদ্যোগ নেয় এবং সাধারণ মানুষও নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ, সাময়িক পরিচ্ছন্নতার চেয়ে স্থায়ী সমাধান এবং ব্যক্তিগত উদাসীনতার পরিবর্তে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ।

পরিচ্ছন্ন খাল, সচল পানিপ্রবাহ ও নিরাপদ পরিবেশ এই তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখে এখনই উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।

আরও