টিসিবির পণ্য পেতে নতুন শর্ত, কার্ড পাবেন যারা
হতদরিদ্র, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিকসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে উপকারভোগী করার নির্দেশনা; কার্ডে লাগবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও নিজের নামে সচল মোবাইল নম্বর
সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার জন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্ড কারা পাবেন, সে বিষয়ে নতুন নীতিমালা জারি করেছে সরকার। এত দিন নিম্ন আয়ের মানুষকে টিসিবির পণ্য দেওয়ার কথা বলা হলেও এবার ‘নিম্ন আয়ের মানুষ’ বলতে কোন শ্রেণির ব্যক্তিদের বোঝানো হবে, তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা ‘সমগ্র বাংলাদেশে টিসিবির উপকারভোগী নির্বাচন এবং ভর্তুকি/সাশ্রয়ীমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা–২০২৬’-এ উপকারভোগী নির্বাচন, কার্ড বিতরণ, পণ্য বিক্রি, হিসাব সংরক্ষণ ও তদারকির বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাঁরা টিসিবির কার্ড পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, হতদরিদ্র পরিবার, নিম্ন আয়ের ব্যক্তি, ভূমিহীন, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর, চা-শ্রমিক, চাতালশ্রমিক, কারখানার শ্রমিক এবং উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিরা টিসিবির কার্ডের জন্য নির্বাচিত হতে পারবেন।
এ ছাড়া কিছু পরিবারকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত এবং অসচ্ছল বয়স্ক নারীপ্রধান পরিবার। যেসব দুস্থ পরিবারে শিশু বা প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে, সেসব পরিবারও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে।
তবে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে টিসিবির সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
কার্ড পেতে যেসব কাগজপত্র লাগবে
টিসিবির কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে উপকারভোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বাধ্যতামূলক। প্রয়োজন অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রও দিতে হতে পারে।
এর পাশাপাশি উপকারভোগীর নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধিত এবং সচল একটি মোবাইল নম্বর থাকতে হবে। অর্থাৎ উপকারভোগীর পরিচয় ও মোবাইল নম্বরের মধ্যে নিবন্ধিত সম্পর্ক যাচাই করা হবে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, নির্বাচিত উপকারভোগীকে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, পৌরসভা অথবা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। নির্বাচিত পরিবারগুলোর তথ্য টিসিবির সেবা অ্যাপের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা হবে।
পরিবারপ্রতি মিলবে তেল, ডাল, চিনি ও চাল
নির্দেশিকায় টিসিবির কার্ডধারী প্রতিটি পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে,
– ২ লিটার ভোজ্যতেল
– ২ কেজি মসুর ডাল
– ১ কেজি চিনি
– খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ৫ কেজি চাল
তবে সরকার প্রয়োজন ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে পণ্যের সংখ্যা, পরিমাণ এবং বিক্রয়মূল্য পরিবর্তন করতে পারবে।
রমজান ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে সাধারণ মানুষের জন্যও ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেলের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করা যাবে।
দেশজুড়ে তদারকিতে থাকবে একাধিক কমিটি
নতুন ব্যবস্থায় শুধু কার্ড বিতরণ নয়, উপকারভোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পৃথক তদারক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এসব কমিটি উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যভান্ডার তৈরি, কার্ড বিতরণ এবং পণ্য বিক্রির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে।
জেলা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি থাকবেন জেলা প্রশাসক। সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে রাখার কথা বলা হয়েছে। এ কমিটিতে পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পৌরসভার মেয়র বা প্রশাসক, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, সমাজসেবা কর্মকর্তা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা এবং টিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা থাকবেন।
উপজেলা পর্যায়েও সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।
ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকবে ‘ট্যাগ টিম’। এসব দল টিসিবির ডিলারের দোকান ও পণ্য বিক্রির নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করে পণ্য সঠিকভাবে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবে।
ডিলারের দোকানে মূল্যতালিকা ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক
নির্দেশিকায় টিসিবির ডিলারদের জন্যও বেশ কিছু নতুন নিয়ম রাখা হয়েছে। ডিলারের দোকানের সামনে টিসিবির পণ্যের ভোক্তা মূল্যতালিকা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন করতে হবে।
পণ্য দোকানে পৌঁছানোর তারিখ ও সময়, নির্ধারিত মূল্য এবং বিতরণ করা পণ্যের সংখ্যা ও পরিমাণ সম্পর্কেও কার্ডধারীদের জানাতে হবে। এর ফলে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে তথ্য গোপনের সুযোগ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ডিলারের দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা
স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিলারের দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জনসমক্ষে পণ্য বিক্রির তথ্য টিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জানানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। গুদামে পণ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। টিসিবির নিজস্ব অথবা ভাড়া করা গুদামে পণ্য রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এসব গুদাম পরিদর্শন করতে পারবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
টিসিবির কার্ড ও উপকারভোগীর সংখ্যা নিয়ে নতুন উদ্যোগ
টিসিবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ কার্ডধারী রয়েছেন। তবে সম্প্রতি টিসিবির একটি অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, অনিয়মের অভিযোগে এরই মধ্যে ৫৯ লাখ কার্ড বাতিল করা হয়েছে।
বাতিল হওয়া কার্ডগুলোর তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে পুনর্বিন্যাস করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের মধ্যে কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
টিসিবির উপপরিচালক শাহাদত হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নির্দেশিকার মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
২০২৬–২৭ অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ পণ্য বিক্রির পরিকল্পনা
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে সাশ্রয়ী মূল্যে বিপুল পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে টিসিবির।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ সময়ে প্রায় ২ লাখ টন ভোজ্যতেল, ২ লাখ ২০ হাজার টন মসুর ডাল এবং ১ লাখ ১০ হাজার টন চিনি বিক্রি করার কথা রয়েছে।
বর্তমানে টিসিবির মাধ্যমে প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১০০ টাকা, প্রতি কেজি মসুর ডাল ৬০ টাকা এবং প্রতি কেজি চিনি ৭০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
সাশ্রয়ী মূল্যে এসব পণ্য বিক্রির ফলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এ খাতে সরকারের প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সেই ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার প্রত্যাশা করছে টিসিবি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ নতুন নির্দেশিকা
নতুন নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য হচ্ছে টিসিবির সুবিধা প্রকৃত নিম্ন আয়ের ও অসচ্ছল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং একই সঙ্গে উপকারভোগীর তালিকা ও পণ্য বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো।
জাতীয় পরিচয়পত্র, নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর, ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, তদারক কমিটি এবং ডিলারের দোকানে সিসিটিভির মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন ও পণ্য বিতরণকে আরও যাচাইযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফলে নতুন ব্যবস্থায় টিসিবির কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক অসচ্ছলতা নয়, নির্দিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়-তথ্য যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।