×
×
Thursday, 29 October, 2026, 11:53 am


পাঁচ ব্রোকারেজের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত শুরু

প্রথম ধাপে মশিউর সিকিউরিটিজের ১২২ বিনিয়োগকারী পেলেন ৩ কোটি ২১ লাখ টাকার চেক; পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ১৭ হাজার ৩৩২ বিনিয়োগকারীর ৭২ কোটি টাকা পরিশোধের উদ্যোগ

শেয়ারবাজারে অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের পাওনা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। প্রথম ধাপে মশিউর সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীদের হাতে ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলে দেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনে মশিউর সিকিউরিটিজের ১২২ জন বিনিয়োগকারীকে মোট ৩ কোটি ২১ লাখ ৫৭ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। এর আগে সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ জন বিনিয়োগকারীর হাতে চেক তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনার ভিত্তিতে ডিএসইর ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড বা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল (আইপিএফ) থেকে এই অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।

পাঁচ ব্রোকারেজের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৭২ কোটি টাকা

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির ঘটনায় পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করা ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারী প্রতারণার শিকার হন।

ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ প্রতিষ্ঠান হলো মশিউর সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, বাঙ্কো সিকিউরিটিজ এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানি।

ডিএসই জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একটি অংশকে ইতোমধ্যে আইপিএফ ও সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে মোট ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

এরপর অবশিষ্ট পাওনা পরিশোধে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীর মোট ৭২ কোটি টাকা পাওনা পরিশোধ করা হবে।

ডিএসইর হিসাব অনুযায়ী, এই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ গ্রাহক তাঁদের বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পাওয়ার আওতায় থাকবেন।

প্রথম ধাপে মশিউর সিকিউরিটিজ

পাওনা পরিশোধের ধারাবাহিকতায় প্রথমে মশিউর সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে।

মঙ্গলবার ঢাকার নিকুঞ্জে ডিএসই ভবনে সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চেক বিতরণ করা হয়। ডিএসই জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ধারাবাহিকভাবে এই কার্যক্রম চলবে।

পরবর্তী দিনে কার কখন চেক নিতে হবে, সেই সময়সূচি সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের আগেই এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।

অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যেককে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ডিএসই কার্যালয়ে এসে তাঁদের পাওনা অর্থের চেক সংগ্রহ করতে হবে।

৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওনা পরিশোধ করবে আইপিএফ

ডিএসইর নতুন সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওনা আইপিএফ থেকে পরিশোধ করা হবে।

এই ব্যবস্থার ফলে ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীর পাওনা সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে ডিএসই। এই অংশের মোট পাওনার পরিমাণ প্রায় ৭২ কোটি টাকা।

তবে যেসব বড় বিনিয়োগকারীর পাওনা ৫ লাখ টাকার বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জন্য পৃথক আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

বড় বিনিয়োগকারীদের অর্থ উদ্ধারে সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ

ডিএসই জানিয়েছে, ৫ লাখ টাকার বেশি পাওনা থাকা ৫৯৫ জন বিনিয়োগকারীর বাকি অর্থ উদ্ধারে খেলাপি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ব্যবহার করা হবে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসের শেয়ার ও সম্পত্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে অর্থ আদায়ের জন্য আইনগত ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএসই।

ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের পাওনা আইপিএফ থেকে পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বড় অঙ্কের পাওনা উদ্ধারের বিষয়টি এখনো আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।

বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় নতুন প্রযুক্তি ব্যবস্থার উদ্যোগ

ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে বিএসইসি।

চেক বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানান, প্রতিটি ব্রোকারেজ হাউসের জন্য একটি সমন্বিত ও নিরাপদ ‘ইউনিফাইড ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার’ এবং ‘অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস)’ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিএসই ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক হিসাবের হালনাগাদ তথ্য সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এতে গ্রাহকের অর্থ ও লেনদেনের ওপর নজরদারি আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাঁদের অর্থ ও সম্পদের নিরাপত্তার ওপর। কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করতে গিয়ে বিনিয়োগকারীরা অর্থ হারালে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থার ওপরও তা প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের পাওনা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগকে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক হিসাব ও লেনদেন পর্যবেক্ষণের কাঠামো আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত বড় বিনিয়োগকারীদের বাকি অর্থ কতটা এবং কত দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সম্পদ শনাক্তকরণ, আইনি প্রক্রিয়া ও অর্থ আদায়ের কার্যক্রমের অগ্রগতির ওপর।

এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান: ৫টি
  • প্রতারণার শিকার বিনিয়োগকারী: ১৭,৯২৫ জন
  • নতুন করে পাওনা পরিশোধের আওতায়: ১৭,৩৩২ জন
  • পরিশোধযোগ্য মোট পাওনা: ৭২ কোটি টাকা
  • ইতোমধ্যে দেওয়া ক্ষতিপূরণ: ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা
  • প্রথম ধাপে: মশিউর সিকিউরিটিজ
  • দ্বিতীয় দিনে চেক পেয়েছেন: ১২২ জন
  • দ্বিতীয় দিনে বিতরণ: ৩ কোটি ২১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা
  • আইপিএফ থেকে পরিশোধের সীমা: বিনিয়োগকারীপ্রতি ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত
  • ৫ লাখ টাকার বেশি পাওনাধারী বড় বিনিয়োগকারী: ৫৯৫ জন
  • বাকি অর্থ উদ্ধারে: আইনগত ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ
[atn_photocard]
আরও