×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 3:12 pm


সার সংকট নয়, সমাধান চাই

বাংলাদেশের কৃষি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে সার ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি। এই দুইয়ের মাঝে পড়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর একটি সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ সাময়িক খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। সংখ্যাটি উদ্বেগের, তবে এটি কোনো দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস নয়, বরং আমাদের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য একটি আগাম সতর্কবার্তা।

এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখলে আমরা সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে পারি।

কেন এই চাপ তৈরি হচ্ছে?

বিশ্লেষকরা তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করছেন।

প্রথমত, জ্বালানি ও সার উৎপাদনের আন্তঃসম্পর্ক। ইউরিয়া সারের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায়, অনেক সময় সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা যায়। ফলে দেশীয় উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে এবং আমাদের আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে দেশে প্রায় ৬৭ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা মেটাতে সরকার ইতোমধ্যে আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক বাজার। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সার ও জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আমদানি ব্যয়ের ওপর পড়ে। এর সাথে এপ্রিল মাসে হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যায় বোরো ফসলের কিছুটা ক্ষতি আমাদের সামগ্রিক মজুদের ওপর চাপ তৈরি করেছে।

তৃতীয়ত, ক্রয়ক্ষমতা। দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্য ক্রয়ের ক্ষমতা কিছুটা কমেছে। এফএও তাদের প্রতিবেদনে এটিকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ, দেশে খাদ্য আছে, কিন্তু সবাই যেন সহজে কিনতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

সরকার কী করছে এবং কী করা যেতে পারে?

এটি আশার কথা যে, সরকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। এই সংকট মোকাবিলায় কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিলে আমরা দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারি।

১. গ্যাস ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার: বোরো মৌসুমের আগে অন্তত তিন মাস সার কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। একটি সার কারখানা চালু থাকলে প্রায় ৫ লাখ টন ইউরিয়া দেশেই উৎপাদিত হয়, যা প্রায় ২ বিলিয়ন টাকার আমদানি সাশ্রয় করে। জ্বালানি বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি যৌথ রোস্টার করা যেতে পারে।

২. আমদানিতে স্বচ্ছতা ও আগাম পরিকল্পনা: সার আমদানি বছরের শেষ মুহূর্তে না করে, অন্তত ৬ মাস আগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা। এতে বিশ্ববাজারে দাম কম থাকার সুবিধা নেওয়া যায়। পাশাপাশি জি-টু-জি ভিত্তিতে সৌদি আরব, মরক্কো ও কানাডার মতো দেশগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি আমাদের সরবরাহ নিরাপদ করবে।

৩. স্মার্ট সার ব্যবহারে কৃষককে উৎসাহিত করা: আমাদের কৃষকরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইউরিয়া ব্যবহার করেন। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সার প্রয়োগ, জৈব সার ও ভার্মি কম্পোস্টের ব্যবহার বাড়াতে পারলে ইউরিয়ার চাহিদা ১৫-২০% কমানো সম্ভব। উপজেলা পর্যায়ে কৃষি অফিসগুলোতে বিনামূল্যে মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

৪. পেঁয়াজ ও সরিষার সাফল্যের মডেল অনুসরণ: গত দুই বছরে সরিষা উৎপাদন ৮ লাখ টন থেকে বেড়ে ১৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এর কারণ ছিল সরকারের প্রণোদনা ও ভালো বীজ সরবরাহ। একই মডেল ধান ও সবজির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

৫. মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে কৃষকের লাভ নিশ্চিত করা: বর্তমানে কৃষক ধান বিক্রি করেন ৮৫০ টাকা মণ দরে, অথচ বাজারে চালের দাম ৬০ টাকা কেজি। এই ব্যবধান কমাতে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র বাড়ানো এবং কৃষক সমবায়কে শক্তিশালী করা যেতে পারে। কৃষক লাভ পেলে তিনি পরের মৌসুমে আরও উৎসাহ নিয়ে চাষ করবেন।

সংকট নয়, এটি প্রস্তুতির সময়

১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের ঝুঁকির সংখ্যাটি আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং আমাদের প্রস্তুত হওয়ার জন্য। বাংলাদেশ এর আগেও অনেক বড় সংকট পার করেছে। ১৯৭৪ সালের পর আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি, যা বিশ্বে একটি বিস্ময়।

এই মুহূর্তে প্রয়োজন গুজব বা আতঙ্ক না ছড়িয়ে, কৃষক, সরকার ও বেসরকারি খাত একসাথে কাজ করা। সার মানে শুধু একটি পণ্য নয়, সার মানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি। এই ভিত্তি মজবুত করতে গ্যাসের সুষ্ঠু ব্যবহার, আমদানিতে দূরদর্শিতা এবং কৃষকের হাতে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।

আমরা যদি এখনই সঠিক পরিকল্পনা নিতে পারি, তবে এই চ্যালেঞ্জই আগামী দিনে বাংলাদেশের কৃষিকে আরও আধুনিক ও টেকসই করে তুলবে।

আরও