আয়ের নতুন রেকর্ড গড়ল চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমস
দেশের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর এবং রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে। বন্দর তার পূর্ববর্তী সব রেকর্ড ভেঙে ফেললেও কাস্টমস রাজস্ব আদায়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
চট্টগ্রাম, ২ জুলাই ২০২৬: সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছর ছিল চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের জন্য মাইলফলক অর্জনের। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আয় করেছে ৬ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৬ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২৩.৫৩ শতাংশ । অপরদিকে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ রাজস্ব আদায় করেছে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৭২ হাজার ৫০২ কোটি টাকার তুলনায় ১২.৩৭ শতাংশ বেশি ।
লক্ষ্যমাত্রার চ্যালেঞ্জ
যদিও কাস্টমস রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা । এই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ব্যাপক ব্যবধান তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ২২ শতাংশই আসে চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে, যা দেশের অর্থনীতিতে এর গুরুত্বকে স্পষ্ট করে তোলে ।
বকেয়া সংকট
রাজস্ব আদায়ের এই অগ্রগতির পাশাপাশি উদ্বেগজনক তথ্য হলো, চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা । এর মধ্যে শুধু পেট্রোবাংলার কাছেই রয়েছে ২১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে ৩ হাজার ৩২২ কোটি টাকা । এই বিপুল পরিমাণ বকেয়া রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
বন্দরের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, আয়ের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। তিনি এই অর্জনে বন্দরের সব স্টেকহোল্ডার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন ।
বন্দরের সক্ষমতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বন্দরের সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল সম্ভব নয়, যা জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল । বে-টার্মিনাল না থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারের লোকসান হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বন্দর ও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক ।
বিশ্ব বন্দর র্যাংকিং
উল্লেখ্য, লন্ডনভিত্তিক শিপিং প্রকাশনা লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরগুলোর মধ্যে ৬৭তম অবস্থানে রয়েছে । দেশের মোট কনটেইনার বাণিজ্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই পরিচালিত হয় এই বন্দর দিয়ে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর অপরিহার্য ভূমিকা নির্দেশ করে ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার যে কোনো প্রচেষ্টা পরিহার করতে হবে এবং রাজস্ব আহরণের দক্ষতা বাড়াতে প্রযুক্তি ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে সংস্কার জরুরি । রাজস্ব আদায়ে বকেয়া সমস্যা সমাধান এবং বে-টার্মিনাল নির্মাণের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে তরান্বিত করবে।