ইলন মাস্ক: বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হতে যাচ্ছেন, যার সম্পদ দিয়ে যা সম্ভব
এক লাখ কোটি ডলারের মালিক হতে চলেছেন টেসলা-স্পেসএক্সের কর্ণধার; যার পরিমাণ অনেক দেশের জিডিপির চেয়েও বেশি, কিনে ফেলা যাবে গোটা বিশ্বের সবচেয়ে দামি পঞ্চাশটি স্পোর্টস ক্লাব।
প্রযুক্তি বিশ্বের বর্তমান সুপারহিরো ইলন মাস্ক শিগগিরই মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা এক লাখ কোটি ডলারের মালিক হতে চলেছেন। বাণিজ্যিক পরিসরে এত বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদের নজির আগে কখনো দেখা যায়নি।
টেসলা ও স্পেসএক্সের মতো অভাবনীয় সাফল্যের মালিক ইলন মাস্কের হাত ধরে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের জগৎ যেমন নতুন মাত্রা পাচ্ছে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের অঙ্কও ছুঁয়েছে কল্পনার সীমা। সম্প্রতি সিএনএনের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে তিনি হতে চলেছেন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার এবং এই বিপুল অর্থ দিয়ে ঠিক কী কী করা সম্ভব।
কীভাবে হচ্ছে ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক?
বর্তমানে মাস্কের হাতে টেসলার শেয়ার ও স্টক রয়েছে ২৭৩ বিলিয়ন ডলার (২৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলার) মূল্যের। তবে তাঁর সম্পদের মূল চাবিকাঠি হলো স্পেসএক্স। আগামী সপ্তাহে স্পেসএক্সের প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি (আইপিও) শুরু হলে তাঁর সম্পদে যোগ হতে পারে আরও ৮৪১ বিলিয়ন ডলার (৮৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার)।
স্পেসএক্সের প্রায় অর্ধেক শেয়ারের মালিক মাস্ক। ধারণা করা হচ্ছে, আইপিওর পর প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারে (১ লাখ ৭৭ হাজার কোটি ডলার)। ফলে শুধু টেসলা ও স্পেসএক্স এই দুই কোম্পানি থেকেই মাস্কের মোট সম্পদ দাঁড়াবে প্রায় ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলার (১ লাখ ১১ হাজার কোটি ডলার)।
ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৭৮৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার (৭৮ হাজার ৮৮০ কোটি ডলার)। তবে এটি মূলত কাগুজে সম্পদ, ব্যাংকে জমা থাকা নগদ নয়। তাঁর সম্পদের মূল্য নির্ভর করছে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে টেসলা ও স্পেসএক্সকে কতটা মূল্যায়ন করেন, তার ওপর।
এত অর্থ ব্যয় করা কি সত্যিই সম্ভব?
মানুষের জীবদ্দশায় যুক্তিসংগত উপায়ে এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা প্রায় অসম্ভব। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক যদি কেউ প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ ডলার করে খরচ করেন, তবুও এক লাখ কোটি ডলার ব্যয় করতে তাঁর এক শতাব্দীর বেশি সময় লেগে যাবে।
নিচে ছয়টি বিষয়ের উদাহরণ দেওয়া হলো, যা মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদের চেয়ে কম মূল্যের:
১. অনেক দেশের অর্থনীতির চেয়েও বড় এই সম্পদ
বিশ্বের মাত্র ২০টি দেশের অর্থনীতির আকার ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জিডিপি মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদের চেয়ে কম।
যেমন:
· তাইওয়ান – ৯৭৭ বিলিয়ন ডলার
· আয়ারল্যান্ড – ৭৭৯ বিলিয়ন ডলার
· সুইডেন – ৭৬০ বিলিয়ন ডলার
· সিঙ্গাপুর – ৬৬০ বিলিয়ন ডলার
· দক্ষিণ আফ্রিকা (মাস্কের জন্মভূমি) – ৪৮০ বিলিয়ন ডলার
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শহরগুলোর চেয়েও বেশি
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও মাস্কের সম্পদের চেয়ে ছোট অর্থনীতির উদাহরণ রয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটসহ বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র ম্যানহাটানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২০২৪ সালে ছিল এক ট্রিলিয়ন ডলারের সামান্য বেশি।
আর যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হিউস্টনের সব ধরনের সম্পত্তির (আবাসিক ও বাণিজ্যিক) সম্মিলিত মূল্য মাত্র ৮৭৯ বিলিয়ন ডলার যা মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদের চেয়ে অনেক কম।
৩. পুরো যুক্তরাষ্ট্রের এক বছরের নতুন গাড়ি বিক্রির চেয়েও বেশি
বাড়ির পর মার্কিন নাগরিকদের সবচেয়ে বড় কেনাকাটা হলো গাড়ি ও ট্রাক। গত বছর নতুন একটি গাড়ির গড় দাম রেকর্ড ৪৮ হাজার ৪০২ ডলারে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১ কোটি ৬৩ লাখ নতুন গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যার মোট মূল্য ছিল প্রায় ৭৮৯ বিলিয়ন ডলার (৭৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলার) এটিও মাস্কের সম্পদের চেয়ে কম।
৪. চার প্রযুক্তি ধনকুবেরের সম্মিলিত সম্পদও যার কাছে হার মানে
ইলন মাস্ক ইতিমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তবে তাঁর সম্পদ শিগগিরই প্রযুক্তি খাতের অন্য ধনকুবেরদেরও পেছনে ফেলে দেবে।
গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন, ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন ও অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস এই চার ধনকুবেরের মোট সম্পদ একত্র করলেও তা প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৯ ট্রিলিয়ন ডলার হয়। অর্থাৎ তাঁদের চারজনের সম্মিলিত সম্পদও মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদের চেয়ে সামান্য কম।
৫. বিশ্বের সবচেয়ে দামি পঞ্চাশটি স্পোর্টস ক্লাব কিনে ফেলা সম্ভব
খেলার ক্লাব বা স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি ধনকুবেরদের প্রিয় বিনিয়োগ ক্ষেত্রগুলোর একটি। বাস্তবতা হলো, এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে পৃথিবীর প্রায় সব বড় খেলার ক্লাব কেনা সম্ভব।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দামি ৫০টি ক্লাবের সম্মিলিত মূল্য মাত্র ৩৫৩ বিলিয়ন ডলার (৩৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার), যা এক ট্রিলিয়ন ডলারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
তালিকার সবচেয়ে মূল্যবান দল এনএফএলের ডালাস কাউবয়েজ, যার মূল্য প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার (১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার)। আর ৫০তম দল এনবিএর টরন্টো র্যাপটরসের মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার (৫০০ কোটি ডলার)।
সবশেষ কথা: কাগুজে সম্পদ হলেও নজিরবিহীন
মাস্কের এই বিপুল সম্পদ মূলত কাগুজে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের ওপরই নির্ভর করছে এর স্থায়িত্ব। তবুও, একক ব্যক্তির সম্ভাব্য মালিকানায় এত বড় অর্থরাশি উঠে আসা ইতিহাসে অভূতপূর্ব। এটি শুধু ধনকুবেরের গল্প নয়, বরং প্রযুক্তি কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পদের সীমানা পুনর্লিখন করছে, তার এক উজ্জ্বল দলিল।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, ফোর্বস, আইএমএফ