ফুজাইরাহ থেকে এলো আরও ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি উপেক্ষা করে ‘এমটি ফসিল’-এ করে এলো ক্রুড অয়েল, চট্টগ্রাম বন্দরে শুরু লাইটারিং প্রক্রিয়া
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ‘এমটি ফসিল’ নামের একটি ট্যাংকার জাহাজ আজ শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে।
পানামার পতাকাবাহী এই জাহাজটি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লাইটারিং (ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর) প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মূল তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) জ্বালানি মজুত বাড়তে যাচ্ছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় চালান
উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর পর এটি বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় বড় চালান। এর আগে গত ৬ মে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন তেল নিয়ে ‘এমটি নিনোমিয়া’ নামের অয়েল ট্যাংকারটি কুতুবদিয়া চ্যানেলে নোঙর করে।
যুদ্ধ শুরুর দীর্ঘ দুই মাস পর বিকল্প পথে সেই চালান আসে। তার আগে সর্বশেষ তেল আমদানি হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি কীভাবে কাজ করছে?
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এই ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াজাত করা হবে। শোধনাগারটির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জাহাজ থেকে তেল খালাসের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
এই শোধনাগার থেকে বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে উৎপন্ন হয় এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেস তেলসহ মোট ১৬ ধরনের জ্বালানি পণ্য।
দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানি নির্ভর
ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন হলেও দেশের বার্ষিক জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ টন। অর্থাৎ শোধনাগারটি দেশের মাত্র ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।
বাকি ৯২ শতাংশ জ্বালানি তেলই আমদানি করতে হয়। মাত্র ৮ শতাংশ আসে স্থানীয় উৎস ও কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অস্থিরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও এক লাখ টন আসছে ইয়ানবু বন্দর থেকে
আশার কথা হচ্ছে, আমদানি প্রক্রিয়া থেমে নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইয়ানবু বন্দরে আরেকটি জাহাজে বিপিসির জন্য প্রায় এক লাখ টন ক্রুড অয়েল লোড করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। এই চালানটি ৩০ মে লোড করা হবে বলে জানা গেছে।
কেন এই চালান গুরুত্বপূর্ণ?
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়ায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালী দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফুজাইরাহ ও ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে বিকল্প রুটে তেল আনা সম্ভব হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক সংকেত।
সংক্ষেপে তথ্যবলি:
বিষয় বিবরণ
জাহাজের নাম এমটি ফসিল (পানামার পতাকাবাহী)
যাত্রা শুরু ফুজাইরাহ বন্দর, সংযুক্ত আরব আমিরাত
গন্তব্য চট্টগ্রাম বন্দর, বাংলাদেশ
তেলের পরিমাণ ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল
আগমনের তারিখ শুক্রবার ভোর (তথ্য অনুযায়ী)
লাইটারিং শুরু সকাল সাড়ে ১০টা
এটি কততম চালান (যুদ্ধ শুরুর পর) দ্বিতীয়
বার্ষিক দেশীয় চাহিদা ৭২ লাখ টন
আমদানি নির্ভরতা ৯২%
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা সামলে বাংলাদেশ তার জ্বালানি আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ‘এমটি ফসিল’-এর এই চালান দেশের জ্বালানি মজুতের চাপ কিছুটা কমাবে। তবে আমদানি নির্ভরতা কমানো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়েও বেশি জোরালো হয়েছে।