আপনার আয় বাড়ছে, কিন্তু কেন আপনি গরিব হচ্ছেন?
মূল্যস্ফীতির অশনিসংকেত: ক্রমাগত কমছে প্রকৃত আয়, বাড়ছে বৈষম্য
সাদামাটা ভাষায় বললে, সংসার চালাতে গিয়ে টেনশন বাড়ছে। মোটা অঙ্কের টাকা আয় হচ্ছে হাতে, কিন্তু মাসের শেষে দেখা যাচ্ছে, আগের চেয়ে বেশি খরচ। সঞ্চয় উধাও। ঋণ বাড়ছে। চিন্তার শেষ নেই।
বাংলাদেশের অর্থনীতি যেখানে নামমাত্র মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বিশ্বের অনেক দেশকে পেছনে ফেলেছে, সেখানে সাধারণ মানুষ কেন দিশেহারা? প্রতিবেদনটি পাঠকের সামনে তুলে ধরবে সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি ও মজুরির টানাপড়েনের চিত্র, যার জেরে আপনার হাতে আসা টাকার অঙ্ক বাড়লেও আপনার কেনার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, অর্থাৎ আপনি আসলে দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।
১. নামমাত্র আয় বনাম প্রকৃত আয়: গণিতটা কী বলছে?
অনেকেই ভাবেন, বেতন বা আয় যদি বাড়ে, তবে সঞ্চয়ও বাড়বে, জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে। কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক সূত্র অনুযায়ী, শুধু নামমাত্র আয় (Nominal Income) বাড়লে হয় না। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রকৃত আয় (Real Income), যা মূল্যস্ফীতি (Inflation) সমন্বয় করে দেখা হয় ।
ধরা যাক, ২০২৩ সালে আপনার মাসিক আয় ছিল ৫০,০০০ টাকা। ২০২৪ সালে কোম্পানি আপনাকে বেতন বাড়িয়ে ৫৫,০০০ টাকা দিল। অর্থাৎ আপনার নামমাত্র আয় বেড়েছে ১০%। কিন্তু এ বছর যদি মূল্যস্ফীতির হার (দাম বৃদ্ধির হার) হয় ১২% তাহলে আপনি আসলে আগের চেয়ে দরিদ্র হয়ে গেছেন। কারণ, ৫৫,০০০ টাকা দিয়ে এখন বাজারে যা কেনা যায়, সেটি আগের ৫০,০০০ টাকার চেয়েও কম ।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঠিক এই ঘটনাই ঘটছে।
২. টানা ৫১ মাস: দুশ্চিন্তার রেকর্ড
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৫১ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে ।
· ২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্য: সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.০৪% ।
· মজুরি বৃদ্ধির হার: একই মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮.১৬% ।
এই ব্যবধানটুকুই পরিবারকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, নামমাত্র মজুরি বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয়ের পর প্রকৃত অর্থে মজুরি কমে যাচ্ছে ।
অধ্যাপক সেলিম রায়হানের ভাষায়, “বাজারমূল্যের সঙ্গে মজুরি বাড়ছে না। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। তাদের ব্যয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অনেকে তাদের সঞ্চয় খরচ করে ফেলছে। অনেকের কাছে তো সঞ্চয়ই নেই” ।
৩. কেন আমরা গরিব বোধ করছি? প্রাত্যহিক সংকট
এই অর্থনৈতিক হিসাব নিত্যদিনের সংসারে কী প্রভাব ফেলছে?
১. খাদ্যদ্রব্যের মূল্য: সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে খাদ্য খাতে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৯% ছাড়িয়েছিল । চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে ডিম-মাছ-মাংস প্রতিদিনের বাজারই হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পুষ্টির ওপর। মধ্যবিত্ত পরিবারেও মাছ-মাংস কমে যাচ্ছে ।
২. সঞ্চয় শেষ: বাড়তি খরচ সামাল দিতে মানুষ তাদের সাবেক সঞ্চয় খরচ করছে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, সন্তানের লেখাপড়ার টাকা স্টক মার্কেট বা সঞ্চয়পত্রের টাকা দৈনন্দিন খরচ মেটাতে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এটি একটি ভয়াবহ সংকেত ।
৩. ঋণের বোঝা: আয় ও ব্যয়ের অমিল পূরণ করতে সাধারণ মানুষকে ঋণের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ঋণগ্রস্ত পরিবার বাড়ছে, যা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র তৈরি করছে ।
৪. বৈষম্যের চূড়া: ধনীরা ধনী, গরিবরা আরও গরিব
বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য। মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ধাক্কা সবার ওপর সমান পড়েনি।
বিশ্বব্যাংকের ‘পোভার্টি অ্যান্ড ইকুইটি অ্যাসেসমেন্ট ২০২৫’ প্রতিবেদন ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। জিনি সহগ (Gini Coefficient) নামক সূচকটি যত বাড়বে, সমাজে বৈষম্য তত বাড়বে। এই সূচকটি ২০২২ সাল থেকে ক্রমাগত বাড়ছে এবং ২০২৫ সালেও তা বেড়েছে ।
অর্থ উপার্জনের নিরিখে জিনি সহগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪-এ (শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে)। অর্থাৎ, আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে উচ্চ আয়ের খাতের মানুষের পকেটে। বিপরীতে, ২০২৫ সালে প্রায় ২০ লাখ নতুন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পতিত হতে পারে, যার ফলে দেশের দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ ছাড়াবে । রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সাল থেকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে ।
৫. কর কাঠামো ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কর কাঠামো অত্যন্ত পরোক্ষ করনির্ভর (ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ইত্যাদি), যা সাধারণ মানুষকে বেশি আঘাত করে। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রত্যক্ষ কর (আয়কর) বাড়িয়ে পরোক্ষ কর কমানো গেলে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭% থেকে কমে ১৭.৭% হতে পারে ।
তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আশার বাণী শোনাচ্ছে। চীফ অ্যাডভাইজার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি বৈঠকে জানানো হয়, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির কারণে ২০২৬ অর্থবছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে । যদি মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান কমে যায়, তবে আস্তে আস্তে প্রকৃত আয়ের চিত্র ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের রোল মডেল, তখন এই ‘প্রকৃত আয় কমে যাওয়া’ পরিস্থিতি একটি জটিল অর্থনৈতিক চাপ। বেতন বাড়ছে, অথচ ভাত থেকে দুধ পর্যন্ত সবকিছুর দাম এত বেড়েছে যে ওই বাড়তি আয় কার্যত ‘শূন্য’।
আপনি যদি মনে করেন মাস শেষে টাকা কম পড়ে, তবে আপনি একা নন। পুরো দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত একটি ‘অদৃশ্য দারিদ্র্যের’ মধ্যে পড়ে আছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আয়ের সঙ্গে খরপের সামঞ্জস্য ফেরানো জরুরি। নইলে পুঁজি ও সম্পদের মালিকানা যেমন ক্রমাগত কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত হবে, তেমনি বিপুল সংখ্যক মেধাবী ও পরিশ্রমী মানুষ প্রতিদিনের সংসারের চাপে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে।