×
×
Friday, 30 October, 2026, 1:39 pm


বিএনপি সরকারের ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেটঃ ৯.৩০ লাখ কোটি টাকার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বাজেট প্রণয়ন করছে বিএনপি সরকার। দেশের ইতিহাসে এটিই হবে সবচেয়ে বড় বাজেট। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যেই এই বিশাল আকারের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাজেট বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।

ঘাটতি ও অর্থায়নের উৎসঃ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। আগামী বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী গত ১৩ ও ১৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে নিয়ে বাজেট বৈঠক করেছেন। সেখানে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সুদ পরিশোধে ব্যাপক চাপঃ

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি ঋণ দ্রুত বাড়ায় এটি সরকারের সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ায় আগামী কয়েক বছর এই চাপ আরও বাড়তে পারে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনবিআর, এনবিআর–বহির্ভূত আয় ও কর ব্যতীত আয় থেকে আগামী অর্থবছরে আয় অনেক বাড়বে। আমরা নির্বাচিত সরকার। আমাদের থাকবে সর্বস্তরের জবাবদিহি।’

কর কাঠামোতে পরিবর্তনের ইঙ্গিতঃ

আগামী বাজেটে কর–কাঠামোয় কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে:

· নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ানো হতে পারে

· মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর বসতে পারে

· ভ্যাট অব্যাহতির তালিকা ছোট করা হতে পারে

বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৬-৭ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, করের আওতা বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প খুব কম।

উন্নয়ন ব্যয়ে রেকর্ডঃ

আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা রেকর্ড। চলতি সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে তা পাস হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর মতে, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো না হলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। তবে তিনি স্বীকার করেন, মেগা প্রকল্পের নামে অর্থ পাচার হলে সেটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই বড় বাজেট ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা যায়, উন্নয়ন ব্যয় কমেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়েছে এবং রাজস্ব লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বৃদ্ধিঃ

নতুন সরকার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী বাজেটে:

· বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার আওতা বাড়ানো হবে

· নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারিত হবে

বিদ্যুৎ, এলএনজি, সার, ওএমএস ও ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি লাগতে পারে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জঃ

বর্তমানে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি। আগামী বাজেটে সেটি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও ডলারের উচ্চমূল্য ও অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থার দুর্বলতায় ভোক্তারা স্বস্তি পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর ধরেই খাদ্যের মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

ব্যবসায়িক খাতে প্রণোদনাঃ

সরকার শিল্প ও বিনিয়োগে গতি ফেরাতে চাইছে। আগামী বাজেটে কিছু খাতে কর ছাড়, শুল্ক–সুবিধা ও পুনঃতফসিল নীতিতে শিথিলতা থাকতে পারে। বন্ধ সরকারি কারখানা চালুর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইজারা ও পিপিপি ভিত্তিতে নতুন বিনিয়োগ কাঠামোর কাজ চলছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে বড় শিল্পগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায়। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও করছাড়ের সুবিধা অনেক সময় নিয়মিত ব্যবসায়ীদের জন্য বৈষম্য তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক চাপ ও সংস্কারঃ

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে বেশ কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিক করা, বিনিময় হার আরও বাজারভিত্তিক করা এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

পাঁচ ইসলামি ব্যাংক একীভূতকরণ, পুনর্মূলধনীকরণ ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ লাগতে পারে।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যঃ

আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৬ থেকে ৬.৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাজেট বড় দরকার, কিন্তু অর্থের সংকট রয়েছে। হিসাব মেলানো একটা বড় কাজ। সব পক্ষকে স্বস্তি দিতে আগামী অর্থবছরের জন্য হিসাব মেলানোর এ সূক্ষ্ম কাজটাই আমরা করছি।’

আগামী বাজেট রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ এই তিনের সমন্বয়ের এক কঠিন পরীক্ষা হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

[atn_photocard]
আরও