×
×
Thursday, 29 October, 2026, 8:13 am


দেশে তুলা উৎপাদন বৃদ্ধিতে ২০ কোটি টাকার প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার

দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়াতে ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২০ কোটি টাকার প্রণোদনা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। টানা তৃতীয়বারের মতো এই প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড (সিডিবি)।

২৬ জেলায় ২৫ হাজার কৃষক পাবেন সহায়তা

এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ২৬টি জেলার প্রায় ২৫ হাজার প্রান্তিক কৃষক এক বিঘা জমিতে সাথি ফসল হিসেবে তুলা চাষের জন্য বিনা মূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক পাবেন। সিডিবির মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজা জানান, এই প্রণোদনা কৃষকদের তুলা চাষে উৎসাহিত করবে এবং অর্থকরী এই ফসলের উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তুলা এখন লাভজনক ফসল

পাট চাষের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পর তুলা বর্তমানে অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। ড. মর্তুজা বলেন, ‘দেশে তুলার চেয়ে বেশি লাভজনক আর কোনো ফসল নেই। কৃষকদের তুলা উৎপাদনে উৎসাহিত করলে তারা যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, তেমনি কাঁচা তুলা আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমবে।’

প্রতি বিঘায় লাভ ৪৫ হাজার টাকা

সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন জানান, প্রতি বিঘা জমিতে তুলা চাষে খরচ হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে এক বিঘা জমিতে ১৫ মণ (প্রতি মণ ৩৭.৩২ কেজি) কাঁচা তুলা উৎপাদন করে একজন কৃষক প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় নিট লাভ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার টাকা।

সাধারণত জুনের মাঝামাঝি সময়ে তুলার বীজ বপন শুরু হয় এবং ডিসেম্বর মাসে ফসল সংগ্রহ করা হয়। প্রতি কেজি তুলা উৎপাদনের বিপরীতে কৃষকরা সরকারের প্রায় চার মার্কিন ডলার আমদানি খরচ সাশ্রয় করছেন।

মাটির স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী

সিডিবির সিনিয়র জিনিং অফিসার কৃষিবিদ মুহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন জানান, তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, কারণ এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায়। একই জমিতে পরপর তিনবার ভুট্টা চাষ করলে মাটির উর্বরতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

প্রণোদনার আওতায় প্রত্যেক কৃষক এক বিঘা জমিতে তুলা চাষের জন্য প্রায় আট হাজার টাকা মূল্যের কৃষি উপকরণ পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে—ছয়শ গ্রাম হাইব্রিড তুলার বীজ, ৫০ কেজি করে টিএসপি ও এমওপি সার, দুই কেজি অণুখাদ্য বোরন সার, ৪৫০ মিলিলিটার ছত্রাকনাশক এবং ১৫০ মিলিলিটার উদ্ভিদের বৃদ্ধিকারক।

জোনভিত্তিক কৃষক বরাদ্দ

প্রণোদনা প্রাপ্তিতে জোনভিত্তিক কৃষক সংখ্যা নিম্নরূপ:

· যশোর: ৩ হাজার
· চুয়াডাঙ্গা: সাড়ে ৫ হাজার
· ঝিনাইদহ: ৩ হাজার ২০০
· কুষ্টিয়া: ৬ হাজার ২০০
· রাজশাহী: ২ হাজার
· বগুড়া: ১ হাজার ২০০
· ঠাকুরগাঁও: ৫০০
· রংপুর: ৬৮০
· ময়মনসিংহ: ১ হাজার ২০০
· ঢাকা, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি: প্রতিটিতে ৩৮০ জন

কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জেলা প্রশাসকদের কাছে এই তহবিল হস্তান্তর করবে। আগামী মাস থেকে জেলা পর্যায়ে প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তার সমন্বয়ে কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হবে।

আগের অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বাড়ছে

২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ১২ হাজার ৩৭৫ জন প্রান্তিক কৃষককে তুলা চাষের জন্য ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা প্রণোদনা দেয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ হাজার ১০০ জন কৃষকের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আগামী অর্থবছরে এই বরাদ্দ বেড়ে ২০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

জিএম তুলা দেশে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, অধিক ফলন নিশ্চিত করতে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) তুলার জাত প্রবর্তন যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিস্থিতি তুলা চাষের জন্য অনন্য সুবিধা প্রদান করে। দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর ও মধ্যাঞ্চল মিলিয়ে ৩২টির বেশি জেলার উঁচু ও পাহাড়ি উভয় ধরনের ভূমি তুলা চাষের অত্যন্ত উপযোগী।

দেশীয় উৎপাদন চাহিদার মাত্র ৩-৪ শতাংশ

বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়, যেখান থেকে বার্ষিক প্রায় দুই লাখ এক হাজার ২৭২ বেল তুলা উৎপাদিত হয়। তবে স্থানীয় এই উৎপাদন জাতীয় চাহিদার মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ পূরণ করতে পারে।

দেশের শক্তিশালী টেক্সটাইল শিল্পের কারণে তুলার বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। বার্ষিক প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল তুলার প্রয়োজন হয়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৭৩ লাখ বেল কাঁচা তুলা আমদানির পেছনে সরকারকে ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড আশা করছে, কৃষকদের এ ধরনের প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে, যা আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

[atn_photocard]
আরও