“মিথ্যা ও অজ্ঞতাবশত হালাল-হারাম নির্ধারণ কুরআনের নির্দেশ লঙ্ঘন”
আন-নাহ্ল ১৬:১১৬
وَلَا تَقُولُواْ لِمَا تَصِفُ أَلۡسِنَتُكُمُ ٱلۡكَذِبَ هَٰذَا حَلَٰلࣱ وَهَٰذَا حَرَامࣱ لِّتَفۡتَرُواْ عَلَى ٱللَّهِ ٱلۡكَذِبَۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلۡكَذِبَ لَا يُفۡلِحُونَ
আর তোমাদের জিহবা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি যা হালাল ও হারাম করেছেন তা পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। মানুষের কাজ হলো সেই নির্দেশনা মেনে চলা, না জানা বিষয়ে থামা, এবং নিজের ইচ্ছা বা জিহ্বার বানানো কথায় হালাল-হারাম ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকা। অথচ বর্তমান সমাজে দেখা যায়, অনেক লোক কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনা না জেনে বা ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা করে “এটা হালাল, ওটা হারাম” বলে ফিরে, যা সরাসরি উল্লিখিত আয়াতের পরিপন্থী।
সূরা আন-নাহ্ল-এর ১১৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা মানুষের একটি গভীর দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন: নিজের ইচ্ছা, ধারণা বা সমাজের প্রভাবে কোনো বিষয়কে “হালাল” বা “হারাম” বলে ঘোষণা করা যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ নেই।
এই আয়াত আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট সত্য তুলে ধরে ধর্ম মানুষের বানানো নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। মানুষ যখন নিজের জিহ্বা দিয়ে, প্রমাণ ছাড়া, কিছু হালাল বা হারাম বলে দেয়, তখন সে মূলত আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে। এটি শুধু একটি ভুল নয়; বরং ঈমানের জন্য একটি গুরুতর বিপদ।
১. ভাষার দায়িত্ব ও সতর্কতা
আমরা প্রতিদিন কথা বলি পরিবারে, সমাজে, ধর্মীয় আলোচনায়। কিন্তু এই আয়াত আমাদের শেখায়, প্রতিটি কথার পেছনে সত্যতা ও জ্ঞান থাকা জরুরি। বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়ে, আবেগ বা প্রচলিত ধারণার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত দেওয়া মারাত্মক ভুল হতে পারে।
২. হালাল-হারামের সীমা নির্ধারণ
ইসলামে হালাল ও হারামের সীমা নির্ধারণের অধিকার কেবল আল্লাহর। কুরআন ও সহিহ হাদিসের মাধ্যমে এই সীমা নির্ধারিত হয়েছে। তাই ব্যক্তি বা সমাজের ইচ্ছা অনুযায়ী নতুন বিধান তৈরি করা বা পুরনো বিধান পরিবর্তন করা এটি এক ধরনের অবাধ্যতা।
৩. মিথ্যা আরোপের ভয়াবহতা
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে, তারা সফল হবে না। এই “অসফলতা” শুধু দুনিয়াতে নয়, আখিরাতেও। অর্থাৎ, মানুষ সাময়িকভাবে লাভবান হলেও, চূড়ান্ত পরিণতি হবে ব্যর্থতা ও ক্ষতি।
৪. বর্তমান সমাজে প্রাসঙ্গিকতা
আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি
কোনো প্রথা বা সংস্কৃতিকে ধর্মের নামে চালানো হচ্ছে
ব্যক্তিগত মতামতকে “ইসলাম বলে” প্রচার করা হচ্ছে
সামাজিক চাপে সত্যকে বিকৃত করা হচ্ছে
এই আয়াত আমাদের সতর্ক করে সত্যকে বিকৃত করে ধর্ম বানানো যাবে না। বরং আমাদের উচিত, প্রতিটি বিষয়ে যাচাই করা এবং জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করা।
এই আয়াত যেন আমাদের অন্তরের আয়না। এটি আমাদের শেখায়—
সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা
জ্ঞানের ভিত্তিতে কথা বলা
আল্লাহর বিধানকে সম্মান করা
একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য তার কথায় যেখানে মিথ্যার ছোঁয়া নেই, অহংকার নেই, বরং রয়েছে সততা ও আল্লাহভীতি। তাই আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আল্লাহর নামে কিছু বলার আগে শতবার চিন্তা করা। এটাই এই আয়াতের প্রাণ একটি সতর্কবার্তা, আবার একই সঙ্গে একটি পথনির্দেশ।