×
×
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ২:১৫ অপরাহ্ণ


“ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ”

দেশে রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে নতুন নীতিগত পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় ভ্যাট নিবন্ধন সনদ বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক চলতি হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও একই শর্ত আরোপের চিন্তা চলছে।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট থাকলেও ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় এসেছে মাত্র ৭ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। এই ব্যবধান কমাতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি। ফলে এবার সরাসরি বাধ্যবাধকতা আরোপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বর্তমানে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করে। কিন্তু এদের বড় একটি অংশ ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া লাইসেন্স নবায়ন সম্ভব হবে না। এতে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে নিবন্ধন নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সহায়ক হবে।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৫০ লাখ প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়ন করে। এই প্রক্রিয়াকে ভ্যাট নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে গড়ে ২ হাজার টাকা ভ্যাট আদায় করা গেলে মাসিক রাজস্ব উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে এবং বার্ষিক আয় হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

এছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গেও ভ্যাট নিবন্ধনকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যবসা শুরু করা বা চলতি হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ভ্যাট সনদ দেখানো বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। এমনকি বিদ্যমান হিসাবের ক্ষেত্রেও তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এতে আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, আয়কর খাতে পূর্বে একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করায় করদাতার সংখ্যা বেড়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ভ্যাট খাতেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবায়নের পথে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মাঠপর্যায়ে ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হন। প্রশাসনিক জটিলতা, জনবল ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা হিসেবে দেখা দেয়। এসব সমস্যা দূর করতে অনলাইন সেবা উন্নত করা এবং প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো—যেমন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ—ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। দেশের বিস্তৃত ব্যবসায়িক কাঠামোকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনতে পারলে রাজস্ব ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে, রাজস্ব ফাঁকি কমবে এবং অর্থনীতির বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিক খাতে অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সহজ ও দ্রুত নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি।

সবদিক বিবেচনায়, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে, যা রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসা খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা জোরদার করবে।

আরও