×
×
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ১২:২৮ অপরাহ্ণ


পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য ও পরকালীন প্রকৃত মর্যাদা

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ২১২ নং আয়াতটি মানবজীবনের একটি মৌলিক দ্বন্দ্বের চিত্র তুলে ধরে—পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য ওআ পরকালীন প্রকৃত সাফল্যের মধ্যে পার্থক্য। এই আয়াতটি কাফিরদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মুমিনদের প্রকৃত মর্যাদার মধ্যে একটি স্পষ্ট তুলনা প্রদান করে।

সূরা বাকারা ২:২১২ আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা

আরবি:
زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَيَسْخَرُونَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا ۘ وَالَّذِينَ اتَّقَوْا فَوْقَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ

বাংলা অনুবাদ:
“যারা কুফরি করে তাদের কাছে দুনিয়ার জীবন সুশোভিত করা হয়েছে এবং তারা মুমিনদের উপহাস করে। অথচ যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তারা কিয়ামতের দিন তাদের উর্ধ্বে থাকবে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত রিজিক দান করেন।” [সূরা আল-বাকারা, ২:২১২]

১. দুনিয়ার জীবন সৌন্দর্যবর্ধিত করার অর্থ

আয়াতে বলা হয়েছে যে, কাফিরদের কাছে দুনিয়ার জীবন সুশোভিত বা আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর অর্থ হল, তারা পার্থিব জীবনের ভোগ-বিলাস, ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়ে যে তারা পরকালের কথা বিস্মৃত হয় । ইবনে কাছীর তার তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, কাফিররা দুনিয়ার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, সম্পদ সংগ্রহ করে কিন্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করে না ।

· সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪: “মানুষের জন্যে মনোরম করা হয়েছে নারী-সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশু ও ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি। এসব হল পার্থিব জীবনের ভোগ্যসামগ্রী। আর আল্লাহর কাছেই আছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।”

এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে দুনিয়ার আসক্তি সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং পরকালের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে ।

২. কাফিরদের মুমিনদের উপহাস করার স্বভাব

· সূরা আল-মুতাফফিফীন, ৮৩:২৯-৩৪: “নিশ্চয় যারা অপরাধী, তারা মুমিনদের নিয়ে হাসাহাসি করত। তারা তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পরস্পর ইশারায় বিদ্রূপ করত। তারা নিজ পরিবার-পরিজনে ফিরে গিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে করতে যেত। আর তারা মুমিনদের দেখলে বলত, এরাই তো পথভ্রষ্ট। অথচ তাদের উপর মুমিনদের তত্ত্বাবধানের জন্য কাউকে প্রেরণ করা হয়নি।”

· সূরা আল-হুমাযাহ, ১০৪:১: “প্রত্যেক পশ্চাতে সমালোচনাকারী, সামনে উপহাসকারীর ধ্বংস।”

৩. মুত্তাকীদের উচ্চ মর্যাদা

আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই প্রতিশ্রুতি যে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তারা কিয়ামতের দিন কাফিরদের উর্ধ্বে থাকবে। তাকওয়ার অর্থ হলো আল্লাহর আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা ।

· সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:২০: “জেনে রাখো, দুনিয়ার জীবন খেলা-ধুলা, অহংকার, তোমাদের মধ্যে পরস্পরের গর্ব-অহঙ্কার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রতিযোগিতা মাত্র। যেমন বৃষ্টি, তার উৎপন্ন ফসল চাষীদেরকে চমৎকার করে; অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা হলুদ দেখতে পাও; পরে তা খড়কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠোর শাস্তি ও আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবন ধোঁকার সামগ্রী বৈ কিছু নয়।”

· সূরা ইউনুস, ১০:৬২-৬৪: “শুনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তাদের জন্য সুসংবাদ দুনিয়ার জীবনেও এবং আখিরাতেও। আল্লাহর বাণীর কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই মহাসাফল্য।”

· সূরা মারইয়াম, ১৯:৬৩: “এটা সেই জান্নাত, যা আমরা আমাদের বান্দাদের মধ্যে যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের উত্তরাধিকার করব।”

৪. বিনা হিসেবে রিজিক দানের অর্থ

আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে, “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত রিজিক দান করেন।”

· সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯৬-১৯৭: “যারা কাফের হয়েছে তারা যেন দুনিয়ার দেশে দেশে বিচরণ করে তা যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। এটা সামান্য ভোগ; অতঃপর তাদের ঠিকানা জাহান্নাম; আর তা নিকৃষ্ট আবাসস্থল। কিন্তু যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত; তারা সেখানে থাকবে চিরকাল। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়ন। আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা সৎকর্মীদের জন্য উত্তম।”

· সূরা সাবা, ৩৪:৩৬-৩৭: “বল, ‘আমার পালনকর্তা যার জন্য ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা সীমিত করে দেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা বোঝে না।’ আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি সেসব নয় যা তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভ করাবে। তবে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান এবং তারা নিরাপদে থাকবে উচ্চ প্রাসাদে।”

১. সম্পদ ও মর্যাদার প্রকৃত মানদণ্ড

এই আয়াতটি শিক্ষা দেয় যে, দুনিয়ার সম্পদ ও ক্ষমতা আল্লাহর ভালোবাসার নিদর্শন নয়। বরং প্রকৃত মর্যাদার মানদণ্ড হলো তাকওয়া।

সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:১৩) এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি বেশি মর্যাদাবান আল্লাহর কাছে যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।”

২. মুমিন ও কাফিরের চূড়ান্ত অবস্থান

পার্থিব জীবনে মুমিনরা নিপীড়িত, দরিদ্র ও উপহাসের শিকার হতে পারে, কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদের অবস্থান হবে উর্ধ্বে।

৩. ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রয়োজনীয়তা

সূরা আল-বাকারার ২১৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে: “তোমরা কি মনে কর যে, জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনও তোমাদের কাছে সে অবস্থা আসেনি যা তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে এসেছিল? তারা দুর্দশা ও কষ্ট ভোগ করেছে এবং এমনভাবে প্রকম্পিত হয়েছে যে, রাসূল ও তার সঙ্গী মুমিনরা বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?’ শুনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।”

সূরা আল-বাকারার ২১২ নং আয়াতটি মুমিনদের জন্য একটি শক্তিশালী সান্ত্বনাবাণী। এটি তাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য ও কাফিরদের উপহাসের কাছে তারা যেন বিচলিত না হয়। প্রকৃত মর্যাদা ও সাফল্য নির্ধারিত হবে কিয়ামতের দিন, যখন মুত্তাকীরা হবে উর্ধ্বে। এই আয়াতের আলোকে কুরআনের অন্যান্য আয়াতসমূহ স্পষ্ট করে যে, দুনিয়ার সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ, আর প্রকৃত সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজন তাকওয়া, ধৈর্য ও আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা।

আল্লাহ বলেন: “আর নিশ্চয় পরকালের জীবনই প্রকৃত জীবন—যদি তারা জানত!” [সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৬৪]

আরও