×
×
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ১:৪৭ পূর্বাহ্ণ


আইসিসি ক্রিকেট রাজনীতি: ছোট দেশগুলো কি সত্যিই সমান সুযোগ পাচ্ছে?

আইসিসি-তে ছোট দেশগুলো সত্যিই সমান সুযোগ পাচ্ছে কিনা—এই প্রশ্নের সরাসরি এবং সৎ উত্তর হলো: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা সমান সুযোগ পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রাজনীতি এবং অর্থনীতি এমনভাবে গঠন করা হয়েছে যেখানে বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই)-এর মতো শক্তিশালী দেশগুলো সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে, যা ছোট ও সহযোগী সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি অসম প্রতিযোগিতার মাঠ তৈরি করেছে .

নিচে এই বৈষম্যের প্রধান ক্ষেত্রগুলো এবং ছোট দেশগুলোর জন্য কিছু ইতিবাচক দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. অর্থনৈতিক বৈষম্য: রাজস্ব ভাগাভাগির মডেল

ছোট দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক। আইসিসির রাজস্ব বন্টন মডেল স্পষ্টভাবে বড় ও ছোট দেশগুলোর মধ্যে একটি বিরাট ব্যবধান তৈরি করে।

· অসম বন্টন: ২০২৪-২০২৭ চক্রে আইসিসির প্রায় $৬০০ মিলিয়ন** বার্ষিক আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর হাতে। এই সময়ের মধ্যে প্রায় **$৫৩৩ মিলিয়ন বিতরণ করা হবে ১২টি পূর্ণ সদস্যের মধ্যে, যেখানে সহযোগী সদস্য দেশগুলো পাবে মাত্র $৬৭ মিলিয়ন ।

· একক আধিপত্য: এই অর্থের সিংহভাগই যায় ভারতে। আনুমানিক ৪০% ($২৩১ মিলিয়ন) রাজস্ব চলে যায় বিসিসিআই-এর কাছে, যা আইসিসির মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক। এই বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি আইসিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভারতকে অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক প্রভাব দেয় ।

· ক্ষতিকর প্রভাব: নেদারল্যান্ডস ক্রিকেট বোর্ডের সদস্য রশিদ শাহ সরাসরি বলেছেন, এই মডেল সহযোগী দেশগুলোর জন্য “ক্ষতিকর” (counter-productive) । এই সামান্য অর্থ টেকসই উন্নয়ন ও বড় দেশগুলোর বিপক্ষে নিয়মিত ম্যাচ আয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত নয়, যা তাদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ।

২. রাজনৈতিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা: “এক দেশ, এক ভোট” নয়

অর্থনৈতিক ক্ষমতার এই তারতম্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রকট।

· ভারতের প্রভাব: সমালোচকদের মতে, আইসিসিতে ভারতের এই আধিপত্য একটি “দ্বৈত মান” (double standard) তৈরি করেছে। যেখানে ভারত তার সুবিধামতো দল বাছাই করতে পারে বা সফর স্থগিত করতে পারে, সেখানে বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলো একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করলে শাস্তির সম্মুখীন হয় ।

· বাস্তব উদাহরণ: ২০২৬ সালে ভারতের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খ biasতে যেতে অস্বীকৃতি জানালে আইসিসি দ্রুত বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে প্রতিস্থাপন করে। অথচ অতীতে ভারতীয় স্বার্থ জড়িত থাকলে ভেন্যু পরিবর্তন বা সময়সূচী পরিবর্তনের মতো নমনীয়তা দেখা গেছে। পাকিস্তান এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, কারণ তারাও বারবার ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাতিল বা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার মতো একই বৈষম্যের শিকার হয়েছে ।

· প্রতিনিধিত্বের সুযোগ: তবে সম্প্রতি কিছু ইতিবাচক লক্ষণ রয়েছে। ২০২৪ সালে আইসিসির বার্ষিক সম্মেলনে সহযোগী সদস্যদের প্রতিনিধি হিসেবে মুবাশশির উসমানী, ইমরান খাজা ও মহিন্দ বল্লিপুরম বোর্ডে নির্বাচিত হয়েছেন। উসমানী সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে সহ-সভাপতির ভূমিকায় আসীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন, যা সহযোগী দেশগুলোর জন্য একটি কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠার সুযোগ ।

৩. প্রতিযোগিতার সুযোগ: বাছাইপর্বের কর্তৃত্ব

বিশ্বকাপের মত বড় আসরে খেলার সুযোগ পাওয়াটাও ছোট দেশগুলোর জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

· কঠিন পথ: সহ-আয়োজক হলেও নামিবিয়ার মতো সহযোগী সদস্য দেশকে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের জন্য সরাসরি সুযোগ না দিয়ে বাছাইপর্বের পথ পারি দিতে হবে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবোয়ের মতো পূর্ণ সদস্য দেশ সহ-আয়োজক হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে ।

· র্যাঙ্কিংয়ের চাপ: শীর্ষ আট পূর্ণ সদস্য দেশ সরাসরি সুযোগ পাবে, কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো একসময়ের শক্তিশালী দল এখন ১০ নম্বরে নেমে যাওয়ায় তাদেরও বাছাইপর্বে খেলতে হতে পারে। নেদারল্যান্ডসের মতো সহযোগী দেশ, যারা সুপার লীগ বাতিলের ফলে আবার সহযোগী প্রতিযোগিতায় নেমে গেছে, তাদের জন্য পথ আরও কঠিন ।

৪. উন্নয়নের উদ্যোগ: কিছু ইতিবাচক দিক

এই সব বৈষম্যের মাঝেও ছোট দেশগুলোর উন্নয়নে আইসিসির কিছু উদ্যোগ রয়েছে, যা আশার আলো দেখায়।

· তৃণমূল উন্নয়ন: আইসিসির ক্রিকেট৪গুড (Cricket4Good) প্রোগ্রাম বিশ্বজুড়ে তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেট ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে। নামিবিয়ায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সময় এই প্রোগ্রামের আওতায় স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণ ক্লিনিকের আয়োজন করা হয়, যা তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার একটি বড় উদ্যোগ ।

· উন্নয়ন পুরস্কার: প্রতিবছর আইসিসি উন্নয়ন পুরস্কার দিয়ে থাকে, যা সহযোগী দেশগুলোতে ক্রিকেটের অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৫ সালে নামিবিয়া তাদের স্কুল ক্রিকেট প্রোগ্রামের জন্য “বছরের সেরা উন্নয়ন উদ্যোগ” পুরস্কার পেয়েছে। ভুটান, ভানুয়াতু, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া এবং তানজানিয়ার মত দেশগুলোও নারী ক্রিকেট ও সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রে তাদের কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়েছে ।

· উদাহরণ: এই উদ্যোগের ফলাফলও দেখা যাচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের মহিলা দল প্রথমবারের মতো ২০২৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে ।

সামগ্রিক চিত্র

পরিশেষে বলা যায়, আইসিসির কাঠামো এমনভাবে তৈরি যেখানে ভারতের মত অর্থনৈতিক ইঞ্জিন দেশ সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। যদিও সহযোগী দেশগুলোর জন্য কিছু উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তবু রাজস্ব বন্টন ও প্রতিযোগিতার সুযোগের ক্ষেত্রে এই অসমতা স্পষ্ট। নেদারল্যান্ডসের রশিদ শাহ যেমন বলেছেন, বর্তমান বাণিজ্যিক মডেল সহযোগী দেশগুলোর জন্য টেকসই নয় এবং তাদের নিজেদের অর্থায়নের পথ বের করতে হয় । পাকিস্তানের এক সংবাদমূলের ভাষায়, এই অবস্থা ক্রিকেটের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ, যেখানে ক্ষমতা নীতিকে গ্রাস করছে ।

আরও