×
×
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ


বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন শুল্ক (Tariff) যুদ্ধ

একটি নতুন শুল্ক যুদ্ধের আভাস ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবারও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পেছনে ফেলে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন, যার লক্ষ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারতসহ বিশ্বের বহু প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। এই তদন্তের ফলাফল নতুন শুল্ক আরোপের পথ খুলে দিতে পারে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ পাল্টা অবস্থান নিচ্ছে ।

নতুন শুল্ক যুদ্ধের সূত্রপাত: মার্কিন পদক্ষেপ ও বিশ্ব প্রতিক্রিয়া

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (USTR) সম্প্রতি ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা ব্যবহার করে দুটি পৃথক তদন্ত শুরু করেছে । এই তদন্তের আওতায় রয়েছে:

· অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা (Excess Industrial Capacity): ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, মেক্সিকো, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা কৃত্রিমভাবে শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে যা বাজারকে অস্থিতিশীল করছে ।

· বলপূর্বক শ্রম (Forced Labor): প্রায় ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা তাদের দেশে বলপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার পক্ষে যথেষ্ট আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করেনি ।

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

মার্কিন এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়নি কেউই। বরং, সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের আগেই শুরু হয়ে গেছে কূটনৈতিক তির্যক বাক্য বিনিময়।

· চীন: মার্কিন এই তদন্তকে “রাজনৈতিক কারসাজি” বলে অভিহিত করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন জানিয়েছেন, “শুল্ক যুদ্ধ বা বাণিজ্য যুদ্ধ কারোরই স্বার্থে কাজে আসে না” ।

· ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ইইউ কমিশনের মুখপাত্র ওলোফ গিল সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিদ্যমান শুল্ক চুক্তি লঙ্ঘিত হলে তারা “দৃঢ় ও সমানুপাতিক জবাব” দেবে ।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছে পরিষ্কার জ্বালানি নীতিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ। সম্প্রতি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) একটি প্যানেল গঠন করেছে, যা চীনের অভিযোগের ভিত্তিতে মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইনের (Inflation Reduction Act) কিছু কর সুবিধা ডব্লিউটিও নিয়ম লঙ্ঘন করছে কিনা তা খতিয়ে দেখবে ।

অর্থনীতিতে প্রভাব: বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই শুল্ক যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতিতে “স্থবির মূল্যস্ফীতি” (Stagflation) ডেকে আনতে পারে। তিনি বলেন, “শুল্ক এবং যুদ্ধের কারণে দাম বাড়ছে, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসছে” ।

অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা ওয়ারউইক ম্যাককিবিন এই শুল্কের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে “ক্যান্সারের” সাথে তুলনা করেছেন। তিনি মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন “সম্পূর্ণ অবিশ্বস্ত বাণিজ্য অংশীদার” হয়ে উঠেছে এবং বিশ্ব ধীরে ধীরে নতুন বাণিজ্য ব্লকে বিভক্ত হচ্ছে ।

বিনিয়োগ উপদেষ্টারাও এই অনিশ্চয়তায় উদ্বিগ্ন। পারিগন ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের রাফিয়া হাসান বলেছেন, “কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হল শুল্ক বাড়া বা কমানো নয়, বরং নীতির এই অনিশ্চয়তা, যা পরিকল্পনা ও মূল্য নির্ধারণকে কঠিন করে তোলে” ।

ডলারের আধিপত্য কি চ্যালেঞ্জের মুখে?

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের একটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি এই বাণিজ্য যুদ্ধ মার্কিন ডলারের বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, “শুল্ক বা অন্য কোনো মাধ্যমে বাণিজ্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করলে ডলারের বিশেষ ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ে।” এর ফলে মার্কিন সুদের হার বাড়তে পারে এবং দেশটিতে মূলধনের বহিঃপ্রবাহ দেখা দিতে পারে ।

২০২৬ সালের শুরুর দিকেই দেখা গেছে, প্রথমবারের মতো ১৯৯৬ সালের পর বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের চেয়ে বেশি সোনা মজুদ করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে চীন ও ভারত ।

বিশ্ব বাণিজ্য এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন শুল্ক আরোপের মাধ্যমে নিজের শিল্প সুরক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন নিজেদের মধ্যে নতুন নতুন বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করে চলেছে । দাভোসে ২০২৬ সম্মেলনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “এটি একটি পরিবর্তন নয়, একটি বড় ভাঙনের (rupture) মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি” । এই ভাঙন শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে আরও খণ্ডিত করবে, নাকি একটি নতুন, আরও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও