গবেষণা বলছে: তরুণদের মধ্যে বাড়ছে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি, জানুন কারণ ও প্রতিকার
একটি প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিয়ে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এটি আর শুধু বয়স্কদের রোগ নয়; ৩০, ৪০ বা এমনকি ২০ বছর বয়সীদের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে 。 এই প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণা ও সমীক্ষার আলোকে তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ক্রমবর্ধমান এই প্রবণতার কারণ এবং তার কার্যকর প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১. সতর্কতা: হার্ট অ্যাটাক এখন তরুণদের কাছেও
গত এক দশকে ২৫-৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্তের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে 。 শুধু তাই নয়, ৩৫-৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের জন্য হাসপাতালে ভর্তির হার বেড়েছে । একটি সমীক্ষা অনুসারে, ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তরুণদের মধ্যে স্থূলতার হার ৯৮% বেড়েছে, যা এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে 。
২. ক্রমবর্ধমান এই প্রবণতার মূল কারণসমূহ
তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের কারণ দুই ধরনের: (ক) প্রচলিত ঝুঁকির কারণ এবং (খ) নতুন উদীয়মান ঝুঁকির কারণ।
ক) প্রচলিত ঝুঁকির কারণগুলোর প্রারম্ভিক উপস্থিতি
যে কারণগুলো আগে বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা কম বয়সীদের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে:
· ধূমপান: তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে বড় এবং সাধারণ কারণ হলো ধূমপান । একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৫ বছর বা তার কম বয়সী হার্ট অ্যাটাক রোগীদের মধ্যে ৭৪% ধূমপায়ী ছিলেন । ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংকেও অনেকে নিরাপদ ভাবলেও, এতে থাকা নিকোটিন রক্তনালী সংকুচিত করে এবং রক্তচাপ বাড়ায়, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি করে ।
· উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল: অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের অভাবে তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ এবং এলডিএল (ক্ষতিকর) কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ছে । ৩৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ৩৮% উচ্চ রক্তচাপ এবং ৪১% উচ্চ কোলেস্টেরলে ভুগছেন বলে একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে ।
· ডায়াবেটিস ও স্থূলতা: টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা তরুণদের মধ্যেও একটি মহামারীর আকার নিচ্ছে। এই দুটি অবস্থাই সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় ।
খ) নতুন উদীয়মান ঝুঁকির কারণ
গবেষণায় কিছু নতুন কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে যা তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের জন্য বিশেষভাবে দায়ী:
· লিপোপ্রোটিন(এ): এটি একটি বংশগত ঝুঁকির কারণ যা রক্তে জমাট বাঁধা ও প্রদাহ বাড়ায়। এশীয় ও লাতিন আমেরিকান তরুণদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায় এবং এটি জটিল প্লাক গঠনে ভূমিকা রাখে ।
· বায়ু দূষণ: মাইক্রো এবং ন্যানোপ্লাস্টিক সহ বায়ু দূষণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি রক্তনালীর ভিতরে প্রদাহ সৃষ্টি করে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বাড়ায় ।
· লং কোভিড: করোনাভাইরাস সংক্রমণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হিসেবে “লং কোভিড” শরীরে একটি প্রদাহজনক অবস্থার সৃষ্টি করে, যা রক্তনালীতে প্লাক অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে ।
· মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার: কোকেন বা অ্যামফিটামিনের মতো উত্তেজক মাদক হঠাৎ করে করোনারি ধমনীতে খিঁচুনি (স্পাজম) সৃষ্টি করতে পারে, যা পরিষ্কার ধমনী থাকা সত্ত্বেও মারাত্মক হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে ।
· অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও এনার্জি ড্রিংক: তীব্র মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত এনার্জি ড্রিংক সেবন তরুণদের হৃদযন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে ।
· পিরিয়ডোনটাইটিস (মাড়ির প্রদাহ): একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাড়ির প্রদাহ হৃদরোগের ঝুঁকি ৯% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে ।
৩. প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়
বিশ্বের চিকিৎসকদের মতে, ৮০% পর্যন্ত অকালমৃত্যু রোধযোগ্য হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব 。 এর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচে উল্লেখ করা হলো:
ক) নিজের শারীরিক অবস্থা জানুন (Know Your Numbers)
· নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: বয়স ২০-৩০ হলেও নিয়মিত রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা এবং বডি মাস ইনডেক্স (BMI) পরীক্ষা করা জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ কোলেস্টেরলকে “নীরব ঘাতক” বলা হয়, কারণ এদের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না ।
খ) হার্ট-স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
· সুষম খাদ্যাভ্যাস: প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট এড়িয়ে চলতে হবে। ফলমূল, শাকসবজি, গোটা শস্য এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। “ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস” (Mediterranean Diet) হার্টের জন্য খুবই উপকারী বলে মনে করা হয় ।
· নিয়মিত ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের ব্যায়াম (যেমন দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা) বা ৭৫ মিনিট জোরালো ব্যায়াম (দৌড়ানো) করা উচিত ।
· ধূমপান ও মাদক ত্যাগ: ধূমপান বা ভ্যাপিং পরিত্যাগ করা একজন ব্যক্তি তার হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য এককভাবে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ নিতে পারেন । অ্যালকোহল সেবনও এড়িয়ে চলা ভালো ।
· ওজন নিয়ন্ত্রণ: BMI ১৮.৫-২৪-এর মধ্যে রাখা এবং পুরুষদের কোমরের মাপ ৯০ সেমি এবং মহিলাদের ৮৫ সেমির মধ্যে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় ।
· পর্যাপ্ত ঘুম: দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখে ।
· মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা: যোগব্যায়াম, ধ্যান বা নিজের পছন্দের শখের কাজে সময় দিয়ে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে ।
গ) চিকিৎসা ও প্রযুক্তির সাহায্য
· লিপোপ্রোটিন(এ) পরীক্ষা: বিশেষ করে যদি পারিবারিক ইতিহাসে অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা থাকে, তবে Lp(a) পরীক্ষা করানো উচিত। যদিও এর জন্য এখনও তেমন কোনো ওষুধ নেই, তবে PCSK9 ইনহিবিটরস নামক কিছু নতুন ওষুধ এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করছে ।
· জিনগত পরীক্ষা: অল্প বয়সে করোনারি ধমনী রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের (যাদের পারিবারিক ইতিহাস আছে) জন্য জেনেটিক টেস্টিং উপকারী হতে পারে ।
তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ক্রমবর্ধমান হার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শুধুমাত্র প্রচলিত কারণ নয়, বায়ু দূষণ, লং কোভিড, মাদকাসক্তি এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মতো নতুন কারণগুলো এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমেই এই রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব। “প্রতিরোধই সর্বোত্তম চিকিৎসা”—এই প্রবাদটি হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য।