চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা: বিশ্ব ব্যবস্থা কি দুই মেরুতে ভাগ হচ্ছে?
চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বর্তমান বিশ্ববিবর্তনের এক অপরিহার্য ও জটিল অধ্যায়। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধ কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই পরিবর্তন আনে নি, বরং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল (গ্লোবাল ভ্যালু চেইন), প্রযুক্তি খাত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। এই বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনটি মূল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রগুলো, ২০২৫-২৬ সালের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলাফল নিয়ে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা উপস্থাপন করে।
প্রতিযোগিতার পটভূমি ও প্রকৃতি
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা নিছক বাণিজ্য ভারসাম্যের খেলা নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা নির্ধারণের এক লড়াই । ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে এই প্রতিযোগিতা প্রকাশ্য রূপ নেয়। মার্কিন লক্ষ্য ছিল চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানো এবং নিজস্ব শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু চীনের রপ্তানি ২০১৭ সালের ৪২০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালে দ্বিগুণ হয়ে ৮২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে । এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, শুল্ক কেবল বাণিজ্য প্রবাহের গতিপথ বদলাতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক চিত্র বদলানো সহজ নয়।
এই প্রতিযোগিতার প্রকৃতি বোঝার জন্য ‘মূল্যশৃঙ্খল’ (গ্লোবাল ভ্যালু চেইন) ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি পণ্যের ‘মেইড ইন’ লেবেল আজকাল প্রায়ই বিভ্রান্তিকর। একটি আইফোন বা কম্পিউটার বিভিন্ন দেশের তৈরি উপাদানে গঠিত। গবেষণা বলছে, চীনের রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ বিদেশি উপাদানের জন্য পুনরায় ব্যয় হয়। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)-র তথ্য অনুযায়ী, মূল্যশৃঙ্খলের নিরিখে চীনের প্রকৃত রপ্তনির্ভর আয় অনেক কম । যেমন আইফোনের মোট খরচে চীনের প্রকৃত মূল্য সংযোজন মাত্র ২.৫ শতাংশ, অথচ মার্কিন কোম্পানি অ্যাপল ডিজাইন, ব্র্যান্ড ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে মুনাফার সিংহভাগ নিজেদের কাছে রাখে । সুতরাং, চীন উদ্বৃত্তের ধারণকৃত পরিসংখ্যান পায়, কিন্তু প্রকৃত মুনাফা এখনও মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আনে। একেই বলা হচ্ছে, “Surplus in China, Profit in the U.S.” ।
২০২৫-২৬: শুল্কযুদ্ধ থেকে প্রযুক্তিযুদ্ধ
২০২৫ সাল চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে বাণিজ্য উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসায়, যা ধাপে ধাপে বেড়ে ১৪৫ শতাংশে পৌঁছায় । জবাবে চীনও পাল্টা শুল্ক বসায়, যদিও বেইজিং ধারণা করেছিল যে ৭০ শতাংশের বেশি শুল্ক বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। চীনের কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-নভেম্বরে চীনের মার্কিন রপ্তানি ৩৮৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ কম । তবে এর চেয়েও বড় ঘটনা ঘটে প্রযুক্তি খাতে। ওয়াশিংটন চীনের কাছে ইথানল, ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) সফটওয়্যার ও হাই-পারফরম্যান্স চিপ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর জবাবে চীন বিরল মাটি (রেয়ার আর্থ) রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। বিশ্বের ৮৭ শতাংশ পরিশোধিত বিরল মাটি, ৭৮ শতাংশ লিথিয়াম এবং ৯৮ শতাংশ গ্যালিয়াম অক্সাইডের যোগান চীনের নিয়ন্ত্রণে, যা মার্কিন অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা ।
কিন্তু এই চিপ নিষেধাজ্ঞা চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশকে থামাতে পারেনি; বরং উল্টো তা চীনা উদ্যোগকে বেগবান করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতে উৎপাদন ১০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, আর রপ্তানি বেড়েছে ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ । চীনা স্টার্টআপ ডিপসিক ৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি শক্তিশালী লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরি করে সিলিকন ভ্যালিকে চমকে দিয়েছে । অধ্যাপক রিচার্ড বাল্ডউইনের ভাষায়, মার্কিন নীতি কার্যত চীনকে আরও আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে এবং মিত্রদের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে ।
বৈশ্বিক প্রভাব ও ‘চায়না শক ২.০’
চীন তার অর্থনৈতিক কৌশল “উচ্চ-গুণগত মানের উন্নয়ন”-এর দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি), ব্যাটারি, সৌর প্যানেল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের অগ্রযাত্রা এখন ‘চায়না শক ২.০’ নামে অভিহিত হচ্ছে । ২০২৪ সালে বিশ্বে ১ কোটি ৭০ লাখ ইভি উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে চীন ১ কোটি ২০ লাখ (৭০ শতাংশের বেশি) তৈরি করেছে ।
চীনের এই ঊর্ধ্বগতি অন্যান্য দেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে শুরু করে ব্রাজিল, কানাডা, ভারত, তুরস্ক ও দক্ষিণ আফ্রিকা চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়েছে বা অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরু করেছে । তবে এই দেশগুলোর অবস্থান জটিল। একদিকে তারা নিজেদের শিল্প বাঁচাতে চায়, অন্যদিকে চীনা বিনিয়োগ ও মূল্যশৃঙ্খলের সাথে সংযোগ ধরে রাখতে চায়। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হলো, চীন এখন কেবল নিম্ন-প্রযুক্তির পণ্য নয়, উচ্চ-প্রযুক্তির পণ্যও রপ্তানি করছে, যেখানে তাদের প্রতিযোগিতা সীমিত ।
কে জিতছে?
বাণিজ্য যুদ্ধের কোনো স্পষ্ট বিজয়ী নেই । নিম্নের ছকে দুই অর্থনীতির ওপর প্রভাব সংক্ষিপ্ত আকারে দেখানো হলো:
দিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা চীনের অবস্থা
বাণিজ্য চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি; বরং আমদানিমূল্য বেড়ে মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে । মার্কিন রপ্তানি ১৮.৯% কমলেও মোট বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে ।
শিল্প ও মূল্যশৃঙ্খল চীনের কাছ থেকে আমদানি কমলেও, ভিয়েতনাম ও মেক্সিকোর মতো দেশ থেকে আমদানি বেড়েছে; পূর্ণাঙ্গ বিচ্ছিন্নতা হয়নি । ইভি, ব্যাটারি ও সেমিকন্ডাক্টরে আত্মনির্ভরশীলতা বেড়েছে; উৎপাদন সক্ষমতা অটুট রয়েছে ।
প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও চিপস অ্যাক্টের মাধ্যমে চীনের অগ্রগতি ধীর করার চেষ্টা । সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ১০.২% ও রপ্তানি ২৪.৭% বেড়েছে; ডিপসিক ও ইইভি লিথোগ্রাফি মেশিনে অগ্রগতি ।
অর্থনৈতিক কৌশল “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর অধীনে শুল্কনির্ভর নীতি; দেশীয় উৎপাদনে ভর্তুকি দেওয়া । “নিউ কোয়ালিটি প্রোডাক্টিভ ফোর্সেস”-এর অধীনে প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধি; অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিকল্প বাজারের ওপর জোর ।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ও ভোক্তারাই শুল্কের মূল বোঝা বহন করছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শুল্কের মাত্র ১৪ শতাংশের খরচ বহন করে বিদেশি রপ্তানিকারকরা, আর ৬৪ শতাংশ খরচ বহন করে মার্কিন ব্যবসা ও ২২ শতাংশ মার্কিন ভোক্তারা । পেন্টাগন পর্যন্ত আমেরিকান অস্ত্র ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ৬ হাজার রকমের ব্যাটারি কম্পোনেন্টের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল, যা মার্কিন কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ।
উপসংহার ও ভবিষ্যৎ পরিক্রমা
চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা একটি জটিল গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে । বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সম্পর্কের ধারা নির্ভর করবে কিছু মূল বিষয়ের ওপর। প্রথমত, শুল্ক আর চাপ সৃষ্টির পুরোনো কৌশল আর কার্যকর নাও হতে পারে, কারণ চীন বিকল্প বাজার ও প্রযুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছে । দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে ।
ভবিষ্যৎ তিনটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে: (১) সম্পূর্ণ পৃথক দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক ব্লকের সৃষ্টি, (২) ইউরোপ ও বৈশ্বিক দক্ষিণের উদীয়মান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ, অথবা (৩) “contested interdependence” অর্থাৎ সহাবস্থান ও প্রতিযোগিতার এক মিশ্র চিত্র । শেষোক্ত সম্ভাবনাটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়। এই নতুন বাস্তবতায় অর্থনীতি ও কূটনীতি একাকার হয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র তারাই টিকতে পারবে, যারা এই আন্তঃনির্ভরশীলতাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারবে, আর যারা নিজেদের অর্থনীতিকে ঝুঁকিমুক্ত ও সহনশীল করে তুলতে পারবে।