স্বর্ণের বাজার: উত্তীর্ণ ৫২০০ ডলার, লক্ষ্য কি ৬৩০০?
বিশ্ব অর্থনীতি অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, আর সেই ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে সোনার দামের উল্লম্ফনে। গত সপ্তাহের লেনদেন শেষে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ৫২৪৭.৯ ডলার/আউন্সে পৌঁছেছে । ২০২৬ সালের শুরুতেই স্বর্ণ ৫৫০০ ডলারের ঐতিহাসিক রেকর্ড স্পর্শ করার পর বর্তমান এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি “দিক-নির্ণয়ের মোড়” । এই প্রবন্ধে আমরা স্বর্ণের এই চড়াইয়ের পেছনের কারণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সামনের পথ কেমন হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করেছি।
ঐতিহ্যবাহী চালকের চেয়েও বেশি কিছু
ঐতিহ্যগতভাবে, ডলার সূচকের পতন ও সুদের হার হ্রাসের সম্ভাবনা সোনার দাম বাড়ায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল। মর্গান স্ট্যানলির বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ সোনা কেনাই এখন বাজারের মূল চালিকা শক্তি । ২০২২ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বার্ষিক ১০০০ টনের বেশি সোনা কিনছে, যা ২০২২ সালের আগের ৪০০-৫০০ টনের গড় থেকে অনেক বেশি ।
এর বাইরেও, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ইরানে হামলা ও ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের সম্ভাব্য বিস্তারের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি ও কানাডা, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে । রয়েুটার্সের কলামনিস্ট মাইক ডোলান এই পরিস্থিতিকে “গোল্ড-প্লেটেড ফিয়ার” বা সোনার প্রলেপ দেওয়া ভয় বলে অভিহিত করেছেন ।
বাজারের মনোভাব: সংশোধন নাকি পুনরুত্থান?
সম্প্রতি স্বর্ণের বাজারে কিছু অস্থিরতা দেখা গেছে। জানুয়ারির শেষে ৫৫০০ ডলারের রেকর্ড স্পর্শ করার পর ফেব্রুয়ারির শুরুতে মূল Correction বা দর সংশোধন হয় । প্রফিট বুকিং এবং সিএমই গ্রুপের মার্জিন প্রয়োজনীয়তা বাড়ানোর কারণে স্বর্ণ ৪৫০০ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল ।
তবে টেকনিক্যাল বিশ্লেষকরা বলছেন, ৪৪০০ ডলারের কাছাকাছি স্তর থেকে স্বর্ণ শক্তিশালী সমর্থন পেয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে । বর্তমানে স্বর্ণ ৫২০০ ডলারের উপরে ট্রেড করছে, যা বুলিশ বা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
কিটকো নিউজের সমীক্ষা অনুযায়ী, ওয়াল স্ট্রিটের ৬৭% বিশ্লেষক আগামী সপ্তাহে স্বর্ণের দাম ৫৩০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন । অ্যাড্রিয়ান ডে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান অ্যাড্রিয়ান ডে মনে করেন, “বাজার নীচের দিকে সংশোধন শেষ করেছে। ৫৫০০ ডলারের কাছাকাছি কিছু টানাটানি হতে পারে, তবে পরবর্তী প্রধান ট্রেন্ড হবে ঊর্ধ্বমুখী” ।
ফিনিক্স ফিউচার অ্যান্ড অপশনের চেয়ারম্যান কেভিন গ্র্যাডির ভাষ্য, “বাজার সব সময় সোজা উপরে যেতে পারে না। বাজারের শক্তি পরীক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায় হল এটাকে বিক্রি করে দেখা। স্বর্ণ সম্প্রতি চাপের মুখে পড়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীরা এখনও জায়গা ছেড়ে যাননি” ।
সম্ভাব্য পথ কোথায়?
বিশ্লেষকরা স্বর্ণের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ধরনের মত দিয়েছেন।
ঊর্ধ্বমুখী লক্ষ্য
· মর্গান জেপি মরগান ২০২৬ সালের মধ্যে স্বর্ণের দাম ৬৩০০ ডলার/আউন্সে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছে ।
· এমকেএস প্যাম্পের গবেষণা প্রধান নিকি শিলস মনে করেন, ঐতিহাসিক গড় হিসেবে বিচার করলে বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এখনও “মাঝপথে” আছে এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য ৬৭৫০ ডলার হতে পারে ।
· ইউবিএস, ডয়চে ব্যাংক এবং সিটিও ৬০০০ ডলারের উপরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও নিম্নমুখী ঝুঁকি
যদি স্বর্ণ ৫২০০-৫৩০০ ডলারের প্রতিরোধ অঞ্চল স্পষ্টভাবে অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়, তবে ফরেক্স.কম-এর বিশ্লেষক রাজান হিলাল সতর্ক করে বলেছেন, শক্তি হ্রাস পেলে গভীর সংশোধন আসতে পারে । তার মতে, যদি ৫১০০ ডলারের সমর্থন স্তর ভেঙে যায়, তাহলে স্বর্ণ আবার ৪৮০০ ডলারে ফিরে যেতে পারে। আরও দুর্বলতা দেখালে ৪৬০০, ৪৫৩০ এমনকি ৪৩৮০ ডলার পর্যন্ত পতনের সম্ভাবনা রয়েছে ।
সাবধানতা ও সুযোগের দ্বৈত সমীকরণ
স্বর্ণের বর্তমান অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসরোডে। একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদা, ডলারের দুর্বলতা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো মৌলিক কারণগুলো টেকসই, অন্যদিকে তীব্র গতি ও টেকনিক্যাল সূচকের সংকেত সতর্ক করে দিচ্ছে যে পথটি মসৃণ হবে না ।
একুইটি গ্রুপের হেড অব রিসার্চ আহমেদ আজ্জামের মতে, স্বর্ণ এখন শুধু নিরাপদ আশ্রয় নয়, এটি একটি আর্থিক সম্পদেও পরিণত হয়েছে, যা অস্থিরতা ও তারল্য আবর্তনের অধীন । ফলে, স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি উচ্চ ঝুঁকির খেলা হলেও, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিটি সংশোধন কৌশলগত কেনার সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
সারণী: স্বর্ণবাজার বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষক/সংস্থা অবস্থান মূল ভবিষ্যদ্বাণী সূত্র
মর্গান জেপি মরগান অত্যন্ত ইতিবাচক ২০২৬ সালের মধ্যে ৬৩০০ ডলার লক্ষ্য
এমকেএস প্যাম্প অত্যন্ত ইতিবাচক সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ৬৭৫০ ডলার
অ্যাড্রিয়ান ডে ইতিবাচক প্রধান ট্রেন্ড ঊর্ধ্বমুখী, ৫৫০০ ডলারে সামান্য প্রতিরোধ
কেভিন গ্র্যাডি সংযত ইতিবাচক সাম্প্রতিক সংশোধন বাজারকে শক্তিশালী করেছে, মূল গল্প অপরিবর্তিত
রাজান হিলাল নিরপেক্ষ/সতর্ক ৫২০০-৫৩০০ ডলার অতিক্রম করতে ব্যর্থ হলে গভীর সংশোধনের আশঙ্কা