×
×
Saturday, 31 October, 2026, 8:15 pm


বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা: অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পুনর্সংজ্ঞা

যন্ত্রের যুগে মানবিক অর্থনীতির সন্ধানে একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) ও অটোমেশন যেখানে একদিকে উৎপাদনশীলতার সীমা লঙ্ঘন করছে, অন্যদিকে তা ঐতিহ্যবাহী চাকরির বাজারকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি করছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বলতে কী বোঝায়? শুধু কি দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, নাকি এর সঙ্গে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও মানবসম্পদের টেকসই বিকাশ জড়িত? সাম্প্রতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক আলোচনা ও গবেষণা বলছে, স্বনির্ভরতার পথে প্রযুক্তি ও পরিশ্রমের সম্পর্কটি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। এই প্রতিবেদনে বিশ্বের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদদের মতামতের আলোকে একটি টেকসই ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গঠনের রূপরেখা তুলে ধরা হলো।

প্রযুক্তির দ্বৈত ভূমিকা: শ্রম-প্রতিস্থাপন বনাম শ্রম-পূরক অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দুটি স্বতন্ত্র স্রোত লক্ষ্য করা যায়। প্রথম স্রোতটি সতর্ক করে দেয় যে বর্তমান প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআই, মূলত “শ্রম-প্রতিস্থাপনকারী” (Labour-Saving) হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু এই প্রযুক্তিকে “সো-সো টেকনোলজি” (so-so technology) বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, সুপারমার্কেটের সেলফ-চেকআউট মেশিনের মতো প্রযুক্তি প্রকৃতপক্ষে তেমন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে না, বরং এটি কেবল কাজের খরচ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয় এবং মানসম্মত চাকরি ধ্বংস করে । ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বিগত দুই দশকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কারণেই শ্রম আয়ের অংশ (লেবার ইনকাম শেয়ার) ১.৬ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে, যা স্থির ক্রয়ক্ষমতায় ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান ।

অপরদিকে, দ্বিতীয় স্রোতের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন এই উদ্বেগ কিছুটা অতিরঞ্জিত। এড ইয়ারডেনির মতো বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক পাইয়ের আকার বড় করে। তাদের মতে, এআই শ্রমিকদের বিলুপ্ত করছে না, বরং তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করছে (Augmenting Workers) । জেরার্ড ম্যাকডোনেলের মতো অর্থনীতিবিদ “সে’স ল” (Say’s Law) উল্লেখ করে বলেন, উৎপাদনই আয় সৃষ্টি করে। যদি এআই মুনাফা বাড়ায়, তবে সেই আয় কারও না কারও কাছে যাবে—শ্রমিক, শেয়ারহোল্ডার বা মূলধনের মালিক—যা পুনরায় ব্যয় বা বিনিয়োগ হবে এবং নতুন চাহিদা সৃষ্টি করবে ।

স্বনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় কাজের ধরন: একটি সমন্বিত পথ বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের আলোচনা থেকে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য নিম্নলিখিত কাজ ও নীতির ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে:

কাজের ধরন / ক্ষেত্র অর্থনৈতিক ধারণা ও লক্ষ্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য / উদাহরণ
মানব-পূরক প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি দক্ষতা বৃদ্ধি, সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন নয়
এনট্রপি-হ্রাসকারী কাজ যত্ন, গবেষণা, পুনরুদ্ধার মঙ্গল ও জ্ঞানের ওপর জোর, মজুরি-কাজ নয়
কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উচ্চ মাত্রার আত্মনির্ভরতা মূল খাতে বিদেশি নির্ভরতা কমানো
নৈতিক অর্থনৈতিক নীতি শ্রমিক কল্যাণ ও সুশাসন নিশ্চিতকরণ প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকের সুরক্ষা, অটোমেশনের সুফলের ন্যায্য বন্টন

প্রথমত: মানব-পূরক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ
স্বনির্ভর হতে হলে প্রযুক্তিকে মানবশ্রমের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নীতি নির্ধারণকে এমনভাবে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে পথ দেখাতে হবে যা অসমতা কমায়। যেমন, খাদ্য বিতরণ প্ল্যাটফর্মগুলিতে সাইকেল চালকদের মোটরবাইক দেওয়ার মতো সহায়ক প্রযুক্তি তাদের উৎপাদনশীলতা ও কর্মপরিবেশ উন্নত করতে পারে ।

দ্বিতীয়ত: “এনট্রপি-হ্রাসকারী” খাতে মনোযোগ
ফিলিপ হামের “সার্বভৌম নেগেনট্রপিক অর্থনীতি” (Sovereign Neganthropic Economy) ধারণাটি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার নতুন দিক উন্মোচন করে। যখন মেশিন অধিকাংশ পণ্য ও সেবা উৎপাদনের দায়িত্ব নেবে, তখন মানুষের সময় মুক্ত হবে যত্ন (care), গবেষণা (research), এবং পুনরুদ্ধার (restoration) -এর মতো কর্মকাণ্ডের জন্য। এই কাজগুলো সমাজের এনট্রপি (শৃঙ্খলাভঙ্গ) হ্রাস করে এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত রচনা করে ।

তৃতীয়ত: কৌশলগত খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সম্প্রতি যে নীতির ওপর জোর দিয়েছে, তাতে “বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উচ্চ মাত্রার আত্মনির্ভরতা” (high levels of self-reliance in science and technology) -কে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে । একটি দেশের জন্য প্রকৃত স্বনির্ভরতা অর্জন মানে হল মূল প্রযুক্তিতে বিদেশির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং ঘরোয়া উদ্ভাবন ক্ষমতাকে শক্তিশালী করা।

চতুর্থত: নৈতিক অর্থনীতি ও শ্রমের মর্যাদা
শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই স্বনির্ভরতা নয়; এর সঙ্গে ন্যায্য বন্টনও জড়িত। শ্লোগল ও সুমনার-এর গবেষণা বলছে, অটোমেশন উন্নয়নশীল দেশগুলিতে “অকাল-অর্থনৈতিক রূপান্তর” (premature de-industrialization) ঘটাতে পারে, যেখানে শ্রমিক উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে স্থানান্তরিত হতে পারে না । রাজস্থানের গিগ ওয়ার্কার আইনের মতো উদ্যোগ এবং কেরালার যাত্রাবিরাম কেন্দ্রের মতো পরিকাঠামো উদাহরণ সৃষ্টি করে যে, প্রযুক্তির পাশাপাশি শ্রমিকের কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও স্বনির্ভর অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ ।

উপসংহার: প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়

বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথ কেবলমাত্র আরও বেশি যান্ত্রিকীকরণ বা আরও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যায় না। বরং, এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে—প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করা, সৃজনশীল ও যত্নমূলক কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য কৌশলগত খাতে আত্মনির্ভর হয়ে ওঠা। ইতিহাস সাক্ষী থাকে যে প্রযুক্তি কখনোই অর্থনীতির ধ্বংস ডেকে আনেনি, বরং এটি অভিযোজন ও সঠিক নীতির মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বর্তমান চ্যালেঞ্জ হল, প্রযুক্তির এই ঢেউকে এমনভাবে কাজে লাগানো যাতে তা সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসে এবং একটি টেকসই, ন্যায়সঙ্গত ও সত্যিকার অর্থে স্বনির্ভর বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে তোলে ।

[atn_photocard]
আরও