কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শ্রমবাজার: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক কাঠামোতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। উনবিংশ শতকের শিল্পবিপ্লবের মতোই এআই-এর অভ্যুত্থান শ্রমবাজারে অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে । উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা উন্নতকরণ এবং নতুন পণ্য ও সেবা সৃষ্টির মাধ্যমে এআই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার বিপুল সম্ভাবনা ধারণ করে। তবে এর পাশাপাশি এটি চাকরি হারানো, বৈষম্য বৃদ্ধি এবং দক্ষতার বৈষম্য সৃষ্টির মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জও উপস্থাপন করে । বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এই দ্বৈত সম্ভাবনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠী এবং শ্রম-নিবিড় উৎপাদন কাঠামো এআই-এর প্রভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন ইঙ্গিত দেয় যে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজার এআই-এর স্বয়ংক্রিয়করণের ঝুঁকি থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত। এই অঞ্চলে মাত্র ৭ শতাংশ চাকরি এআই-এর মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, যা অন্যান্য উদীয়মান বাজার অর্থনীতির ১৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই হার আরও কম, মাত্র ১.৪৪ শতাংশ চাকরি সরাসরি এআই-এর সাথে সম্পর্কিত । এই পরিসংখ্যান আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতাসক্ষমতা ধরে রাখতে এবং এআই-এর সুফল পেতে বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি এবং অনানুষ্ঠানিক সেবাখাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট শ্রমশক্তির আকার প্রায় ৭৩.৭ মিলিয়ন । প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ নতুন কর্মপ্রার্থী বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, যাদের মধ্যে ছয় লাখেরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট । উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির একটি বিরাট অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮৫.১ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে নিয়োগ-বর্জনের প্রক্রিয়া অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং দক্ষতা উন্নয়নে নিয়োগকর্তাদের কোনো ভূমিকা নেই ।
এই অনানুষ্ঠানিক কাঠামো কর্মীদের জন্য এক বিশেষ দুর্বলতা সৃষ্টি করে। প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির মতো এখানে চাকরি স্থায়িত্ব বা পুনর্বাসনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি সহজেই এই খাতের অনেক রুটিন কাজ প্রতিস্থাপন করতে পারে, যার ফলে কর্মীরা সহজেই বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক খাতেও সমস্যা রয়েছে। ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পান ।
এআই-এর সম্ভাব্য প্রভাব: সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ইতোমধ্যেই এআই-এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। আধুনিক মেশিন প্রবর্তনের ফলে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কর্মীদের শারীরিক শ্রম কমেছে। আশুলিয়ার একটি তৈরি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপক মো. আবদুল কুদ্দুস জানান, এআই-চালিত মেশিন প্রবর্তনের পর উৎপাদন হার চারগুণ বেড়েছে । কিন্তু এই প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। বর্তমানে অনেক কারখানায় আধুনিক মেশিন থাকলেও তা চালানোর মতো দক্ষ জনবল এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। একটি বড় কারখানায় সম্পূর্ণ এআই-চালিত সিস্টেম স্থাপনে বর্তমানে ৬ থেকে ১২ মাস সময় লাগে, যা দক্ষ দল থাকলে মাত্র ২-৩ মাসে সম্ভব ।
এআই-এর প্রভাবে কিছু খাতে কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়লেও, নতুন কিছু খাতও সৃষ্টি হচ্ছে। ডেটা এন্ট্রি, কল সেন্টার এবং মৌলিক হিসাবরক্ষণের মতো রুটিন কাজ সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বে । অন্যদিকে ডেটা লেবেলিং এবং অ্যানোটেশনের মতো নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ইউনেস্কোর এআই র্যাম প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মী এআই এবং স্বয়ংক্রিয়করণের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন । তবে এই ঝুঁকি এড়ানোরও উপায় রয়েছে।
একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশে এআই-এর সাথে সম্পূরক (কমপ্লিমেন্টারি) চাকরির সংখ্যা বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় এআই-সম্পর্কিত চাকরির প্রায় ৭০ শতাংশই সম্পূরক প্রকৃতির, অর্থাৎ এআই মানুষের কাজ প্রতিস্থাপনের পরিবর্তে তাকে আরও দক্ষ করে তুলবে । শিক্ষকতা, আইন ও চিকিৎসার মতো পেশায় এই সম্পূরক সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল দুর্বলতা হলো এর সনদ-কেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর কাঠামো। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে যত বেশি শিক্ষিত একজন ব্যক্তি, তার বেকার হওয়ার ঝুঁকি তত বেশি । এটি শিক্ষাব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সুস্পষ্ট অমিলকে নির্দেশ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে দক্ষতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছে, বাজারে তার চাহিদা নেই।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, এটি উৎপাদন ব্যবস্থা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং শ্রমবাজারের মৌলিক রূপান্তর । বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদ্যমান চাকরি রূপান্তরিত হবে ।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে বেশ কিছু পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে সৃজনশীল ও সমস্যা সমাধানমূলক দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে এবং সমাজে এর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে অংশ নেয় । তৃতীয়ত, এআই-কে শিক্ষাক্ষেত্রে নিষিদ্ধ না করে বরং শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে পাঠ্যক্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা যায়।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ: সাফল্য ও ব্যর্থতার গল্প
বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে এআই গ্রহণের চিত্র অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কৃষিখাতে ড. চাষি অ্যাপের সাফল্য একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০২১ সালে চালু হওয়া এই অ্যাপটি কৃষকদের স্মার্টফোনের মাধ্যমে ফসলের রোগ শনাক্ত করতে, সারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে এবং সাত দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেতে সহায়তা করছে । এই অ্যাপের বর্তমানে ৮৭ হাজার নিবন্ধিত ব্যবহারকারী রয়েছে এবং এর ফলে ফসলের ফলন ১২-১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, কীটনাশক ব্যবহার ২৫-৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সময় ও খরচ সাশ্রয় হয়েছে গড়ে ৩৩ শতাংশ ।
অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে এআই গ্রহণের চিত্র মিশ্র। ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচুর তথ্য থাকলেও তা বিশ্লেষণ করার মতো দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩২ শতাংশ ব্যাংকের এআই-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নীতি রয়েছে এবং মাত্র ১১ শতাংশ নিজেদের সম্পূর্ণ প্রস্তুত মনে করে ।
তৈরি পোশাক খাতে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামের সাথে বাংলাদেশের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। ভিয়েতনাম আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, সফটওয়্যার ও শিল্পপ্রকৌশলে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে তারা উৎপাদন খরচ কমিয়ে গুণগত মান বাড়াতে সক্ষম হয়েছে । বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বাজার হারাচ্ছে ।
নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
এআই-এর যুগে টিকে থাকতে এবং এর সুফল পেতে বাংলাদেশকে বেশ কিছু নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন এআই থেকে উপকৃত হওয়ার পাঁচটি উপায় নির্দেশ করেছে: শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদে বিনিয়োগ, শ্রমবাজারের disruption ব্যবস্থাপনা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সরকারি পর্যায়ে এআই গ্রহণ ।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার প্রায় ৬২ শতাংশ, যা উন্নত দেশের তুলনায় কম। গ্রামীণ এলাকায় এই হার আরও কম, মাত্র ৩৬ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলের তুলনায় ৩২ শতাংশ পয়েন্ট কম । এআই অ্যাপ্লিকেশনের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং নিরাপদ ডেটা ব্যবস্থা অপরিহার্য। তাই ডিজিটাল বিভাজন দূর করতে বিনিয়োগ জরুরি।
সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলের অংশ হিসেবে একটি জাতীয় এআই দক্ষতা কাঠামো তৈরি করছে, যেখানে তৈরি পোশাক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে । তবে আইন, নীতি ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো প্রণয়ন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ-আল-মামুন মনে করেন, “এআই-এর সঠিক ও সময়োপযোগী গ্রহণ আশীর্বাদ হবে, কিন্তু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ ছাড়া এটি সহজেই অভিশাপে পরিণত হতে পারে” ।
উপসংহার: সামনের পথ
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এআই-এর প্রভাব অনিবার্য। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রাঞ্জিস্কা ওন্সর্গে বলেছেন, “বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ এবং এআই-এর ক্রমবর্ধমান গ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য রূপান্তরকারী হতে পারে” । তবে এই রূপান্তর ইতিবাচক হবে কি নেতিবাচক, তা নির্ভর করবে আমাদের প্রস্তুতির ওপর।
বাংলাদেশের জন্য সুযোগের জানালা খুব বেশি দিন খোলা থাকবে না। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৫-৭ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) স্থিতিশীল হবে এবং ২০৩০-৩৫ সালের মধ্যে এটি হ্রাস পেতে শুরু করবে । এই সীমিত সময়ের মধ্যেই যদি আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও দক্ষতা উন্নয়ন কাঠামোতে মৌলিক সংস্কার আনতে না পারি, তাহলে এক বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আমরা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হব।
প্রয়োজন একটি সমন্বিত, দূরদর্শী ও গণতান্ত্রিক কৌশল। এই কৌশলের কেন্দ্রে থাকবে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং একটি শক্তিশালী এআই নীতি কাঠামো। ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শুভ্র পাল সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন, “বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এখন আর মানুষ বনাম এআই-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি এখন এআই বোঝে এমন দেশ বনাম যে দেশগুলো বোঝে না, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা” । বাংলাদেশকে কোন পক্ষে থাকতে চায়, তা ঠিক করার সময় এখনই।