×
×
Thursday, 30 July, 2026, 5:23 pm


জলবায়ু পরিবর্তন ওি অর্থনৈতিক ক্ষতি: দুর্যোগ, কৃষি, শিল্প ও বীমা খাতে প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকট হিসেবে চিহ্নিত। এর প্রভাব শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি খাতে গভীর প্রভাব ফেলছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করছে। ২০২৪ সালে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে, যা একটি বিপদের সীমা অতিক্রমের ইঙ্গিত দেয় । এই প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ, কৃষি, শিল্প ও বীমা খাতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ও দুর্যোগের চিত্র

জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ২০২৪ সালে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬৮ বিলিয়ন ডলার । এর মধ্যে বিমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২১শ শতাব্দীর গড়ের চেয়ে ৫৪ শতাংশ বেশি । ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দশকে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২ ট্রিলিয়ন ডলার । শুধু ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৮৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০০০ সালের পর থেকে গড়ের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি । ২০২৩ সালে চীনে জলবায়ু দুর্যোগে ৩০৮ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার) অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় । ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার দেশগুলোতে ১৯৮০ সালের পর থেকে আবহাওয়া ও জলবায়ু সম্পর্কিত ঘটনায় মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৪৮৭ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে ।

কৃষি খাতে প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত হলো কৃষি। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের অনিয়ম ফসলের উৎপাদনশীলতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। গত তিন দশকে কৃষি খাত জলবায়ু সংক্রান্ত দুর্যোগে ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ-সম্পর্কিত অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই খাতে ঘটে । ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রতিবছর প্রতিকূল আবহাওয়ায় কৃষিতে ২৮ বিলিয়ন ইউরোর বেশি ক্ষতি হয়, যা মোট ফসল ও পশুসম্পদ উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশের সমতুল্য । চরম আবহাওয়ার মধ্যে রয়েছে ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা, তুষারপাত, তাপপ্রবাহ ও শক্তিশালী বাতাস। যেমন খরা ফসলের বৃদ্ধি সীমিত করে, অন্যদিকে তাপপ্রবাহ সালোকসংশ্লেষণের হার কমিয়ে পরাগরেণু ধ্বংস করে দেয় ।

ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন, যারা বিশ্বের খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করেন। তাদের জন্য কৃষিঋণের চাহিদা ৩২৩ বিলিয়ন ডলার হলেও সরবরাহ রয়েছে মাত্র ৯৫ বিলিয়ন ডলার । বিমার অভাবে কৃষকরা নিজেরাই জলবায়ু অভিযোজনে বার্ষিক ৩৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছেন । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসচার, রেঞ্জল্যান্ড ও ফোরেজ (PRF) বিমা পরিকল্পনায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০২৪-৫০ সালের মধ্যে গড় বার্ষিক নিট পরিশোধ বর্তমান ৬০৩ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৯৫ মিলিয়ন থেকে ২.৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে ।

শিল্প খাতে প্রভাব

শিল্প খাতও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়ী সম্পদের বার্ষিক ক্ষতি ৫৬০ থেকে ৬১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে এবং ২০৫৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে । এর ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে কোম্পানিগুলোর গড় বার্ষিক আয় ৬.৬ থেকে ৭.৩ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং ইউটিলিটি, টেলিকম ও ভ্রমণ খাতে এই ক্ষতি ২০ শতাংশের বেশি হতে পারে ।

নেদারল্যান্ডসের পরিসংখ্যান অফিসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অস্বাভাবিক আবহাওয়া নির্মাণ, উৎপাদন ও জ্বালানি খাতের মূল্য সংযোজনে প্রভাব ফেলেছে । অন্যদিকে ট্রানজিশন রিস্ক বা নিম্ন-কার্বন অর্থনীতিতে রূপান্তরের ঝুঁকি শিল্প খাতের ওপর প্রভাব ফেলছে। চীনের ২৮টি শিল্পখাতের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চতর ট্রানজিশন রisk শিল্প খাতের রিটার্ন কমিয়ে দেয় এবং প্রত্যক্ষ শারীরিক ঝুঁকি এই নেতিবাচক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে । তবে সবুজ উদ্ভাবন ও কার্বন বাজারের অনিশ্চয়তা এই প্রভাব প্রশমিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে ।

বীমা খাতে প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তন বীমা শিল্পের জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। জলবায়ু দুর্যোগে বিমাকৃত ক্ষতি বার্ষিক ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে প্রতি দশকে এই ক্ষতি দ্বিগুণ হচ্ছে । সুইস রি-এর তথ্যমতে, প্যারিস চুক্তির পরের দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিমাকৃত ক্ষতি প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ২০১৫ সালের ৭৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে । ইনশোর অাওয়ার ফিউচারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে বৈশ্বিক বিমাকৃত আবহাওয়াগত ক্ষতির এক-তৃতীয়াংশের বেশি (প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার) জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়েছে এবং গত দশকে জলবায়ু-যুক্ত ক্ষতির হার ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে ।

কানাডায় ২০২৪ সালে জলবায়ু দুর্যোগে বিমা দাবির পরিমাণ ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে । ২০২৪ সালে ক্যালগেরির শিলাবৃষ্টিতে একক ঘটনায় প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারের বিমাকৃত ক্ষতি হয় । ইউরোপীয় ইউনিয়নে কৃষিতে জলবায়ুজনিত ক্ষতির মাত্র ২০-৩০ শতাংশ বিমার আওতায় আছে, বাকিটা কৃষক ও সরকারকে বহন করতে হয় ।

ক্রমবর্ধমান এই ক্ষতির ফলে বিমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিমার অযোগ্য হয়ে পড়ছে । একটি বড় “ঝুঁকি স্থানান্তর” প্রক্রিয়া চলছে, যেখানে বিমা শিল্প তাদের ঝুঁকি সাধারণ মানুষ, ব্যবসা ও রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে । বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে অঙ্ক কষা ভুল প্রমাণিত হবে এবং প্রিমিয়াম এত বেশি হবে যা সাধারণ মানুষ বহন করতে পারবে না ।

উপসংহার ও সুপারিশমালা

জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। কৃষি থেকে শুরু করে শিল্প ও বীমা—সব খাতই চরম আবহাওয়া ও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও বহুমুখী পদক্ষেপ।

প্রথমত, কৃষিঋণ ও কৃষিবিমাকে সমন্বিত করতে হবে। বিমার সঙ্গে ঋণ একীভূত করলে ঋণখেলাপি কমে এবং কৃষকের ঋণপ্রাপ্তির সম্ভাবনা ১৫-২১ শতাংশ বেড়ে যায় । দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে। পুনর্বিমা কোম্পানি ও সরকারের অংশীদারত্বে উদ্ভাবনী বীমা মডেল তৈরি করা যেতে পারে । তৃতীয়ত, জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রতিটি ডলার অভিযোজন বিনিয়োগ ১৯ ডলার পর্যন্ত ক্ষতি এড়াতে পারে । চতুর্থত, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে আসতে হবে, কারণ বিমা কোম্পানিগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করছে যা জলবায়ু সংকটকে আরও গভীর করছে । পঞ্চমত, উন্মুক্ত তথ্য প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, যেমন ডিজিটাল টুইন ও স্যাটেলাইট নজরদারি, যা দুর্যোগ পূর্বাভাস ও মোকাবেলায় সহায়ক ।

সবশেষে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দ্রুত নিষ্ক্রিয়তা আর বিলাসিতা নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত হ্রাস করতে না পারলে আগামী দশকগুলোতে জলবায়ু ক্ষতি ক্রমাগত বাড়তে থাকবে এবং এটি একসময় বীমা শিল্প ও সমগ্র অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে । তাই এখনই সময় সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের।

আরও