×
×
Thursday, 29 October, 2026, 10:10 am


৩৬ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ বনাম ৩২% খেলাপি ঋণ – কোথায় দাঁড়িয়ে অর্থনীতি?

২০২৬ সালের অক্টোবরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক দ্বৈত চিত্র উপস্থাপন করছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স প্রবাহে স্বস্তির হাওয়া, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের ঐতিহাসিক খেলাপি ঋণ সংকট।

এই প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি: ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ (NPL) এবং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব। এটি এমন একটি বিষয় যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি স্তরকে প্রভাবিত করছে।

বর্তমান সামষ্টিক চিত্র – সংখ্যায় অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর Bangladesh Development Update অনুযায়ী বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩.৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। যা গত দশকের গড় ৫.৬ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। এডিবি তাদের পূর্বাভাস আরও কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে, যা এপ্রিলে ছিল ৪.৭ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.২২ শতাংশ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি থাকবে ৮.৬ শতাংশ।

এই চিত্রের মধ্যে সংগতির জায়গা হলো বৈদেশিক খাত।

রিজার্ভ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১১ অক্টোবর ২০২৬-এ দেশের মোট (গ্রস) রিজার্ভ বেড়ে ৩৬.২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ-এর বিপিএম৬ পদ্ধতিতে এই রিজার্ভ ৩১.৪০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালের শেষে যা ছিল মাত্র ২১.৪ বিলিয়ন ডলার। মুডিস এই উন্নতির পেছনে রেকর্ড রেমিট্যান্স এবং নমনীয় বিনিময় হারকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রেমিট্যান্স: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৯.৩৬৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৩.১ শতাংশ বেশি।
মজুরি বনাম মূল্যস্ফীতি: ২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে মজুরি বৃদ্ধির হার ৭.৯০ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে।

এটাই আজকের বাংলাদেশের মূল অসঙ্গতি: বাইরের খাতে স্থিতিশীলতা ফিরলেও ভেতরের খাতে – বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় – চাপ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক একে স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মূল অসঙ্গতি – খেলাপি ঋণের ভয়াবহতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ ক্ষত হলো ব্যাংকিং খাত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ডিসেম্বর ২০২৪-এ ২০.২ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ৩৫.৭৩ শতাংশে উঠেছিল, যা মার্চ ২০২৬-এ কিছুটা কমে ৩২.২৬ শতাংশে এসেছে। নিট খেলাপি ঋণ একই সময়ে ১০.৫৭ শতাংশ থেকে ২৬.৪ শতাংশে উঠে ১৫.০১ শতাংশে নেমেছে।

টাকার অঙ্কে এই সংকট আরও ভয়াবহ। প্রায় ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে আটকে আছে বলে একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।

কেন এই সংকট হলো?
১. রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিচালকদের যোগসাজশে নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ।

২. বারবার ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফের সংস্কৃতি।

৩. দুর্বল কর্পোরেট গভর্ন্যান্স এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির শিথিলতা।

এর ফল হলো: ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমছে, মূলধন ঘাটতি বাড়ছে, এবং আমানতকারীদের আস্থা কমছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ মে ২০২৬-এ নেমে এসেছে মাত্র ৫ শতাংশে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে ভয় পাচ্ছে।

মুদ্রানীতির টানাপোড়েন – সংকোচন বনাম প্রবৃদ্ধি

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কঠিন দ্বন্দ্বে আছে।

সংকোচনমূলক অবস্থান: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় দুই বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছিল। এর ফলে প্রকৃত সুদহার ডিসেম্বর ২০২৫-এর শেষে প্রথমবারের মতো ধনাত্মক (+১.৫১%) হয়।

প্রথম শিথিলতা: প্রায় ৬ বছর পর, ৩১ জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ করে। উদ্দেশ্য ছিল মৃতপ্রায় বিনিয়োগে গতি আনা।

আবার স্থিতাবস্থা: কিন্তু ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মুদ্রানীতি কমিটির ১৪তম সভায় সুদহার আবার ৯.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা এবং দেশীয় জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পর্যবেক্ষণ।

এখানেই নীতির অকার্যকারিতা (Transmission Failure) স্পষ্ট। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “When monetary policy cannot fully transmit” – যখন মুদ্রানীতি পুরোপুরি কাজ করে না। সুদহার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি কমছে না, কারণ মূল্যস্ফীতির কারণ শুধু চাহিদা নয়, বরং জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজার সিন্ডিকেট।

অন্যদিকে উচ্চ সুদহারের কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে পারছেন না। ফলে বিনিয়োগ কমছে, কর্মসংস্থান কমছে। বিশ্বব্যাংক বলছে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সীমিত সরকারি বিনিয়োগ মিলে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্কারের রোডম্যাপ – আশার আলো কোথায়?

বাংলাদেশ ব্যাংক এখন একটি কঠোর রোডম্যাপ নিয়েছে। লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের শেষে সরকারি খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশে এবং ২০২৭ সালের শেষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা।

এর জন্য দুটি ধাপ:

প্রথম ধাপ (২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত): Special Exit সুবিধা। যাদের ঋণ ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত “খারাপ বা ক্ষতি” হিসেবে শ্রেণীকৃত, তারা যদি ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এককালীন আসল টাকা পরিশোধ করে, তবে সমস্ত সুদ মওকুফ করা হবে। এটি একটি শেষ সুযোগ।

দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭ থেকে): কঠোর প্রয়োগ। ব্যাংক পরিচালকরা মালিকানা হারাতে পারেন, এবং প্রয়োজনে ব্যাংক একীভূতকরণের পথে যাওয়া হবে।

এছাড়া মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল-এ উন্নীত করেছে, কারণ রিজার্ভ এখন চার মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম।

উপসংহার – সংগতি ফেরাতে কী প্রয়োজন?

বাংলাদেশের আজকের অর্থনীতিতে তিনটি সংগতি এবং তিনটি অসঙ্গতি পাশাপাশি চলছে।

সংগতি:
১. রিজার্ভ ৩৬.২১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত এবং রেমিট্যান্সে ১৩.১% প্রবৃদ্ধি।

২. নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা বাজারের অসঙ্গতি দূর করেছে।

৩. রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমায় মুডিসের দৃষ্টিভঙ্গি স্থিতিশীল হয়েছে।

অসঙ্গতি:
১. প্রবৃদ্ধি ৩.৪% এবং মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪% – একসাথে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির স্ট্যাগফ্লেশন ঝুঁকি।

২. ব্যাংকিং খাতে ৩২.২৬% খেলাপি ঋণ এবং ৫% বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি – অর্থাৎ টাকা আছে কিন্তু বিনিয়োগে যাচ্ছে না।

৩. মজুরি বৃদ্ধি ৭.৯০% কিন্তু মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪% – মানুষের প্রকৃত আয় কমছে।

তথ্য সুত্রঃ বাংলাদেশ ব্যাংক, বিবিএস, বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং মুডিস।

[atn_photocard]
আরও