×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 10:10 am


সকালে ঘুম থেকে উঠেই মুখ শুকিয়ে যায়, মাথাব্যথাও হয়? অবহেলা নয়, হতে পারে স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ

রাতে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তি বিপজ্জনক ঘুমের রোগের ইঙ্গিত দিতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে হৃদ্‌যন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব।

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মুখ ও গলা শুকিয়ে থাকা, মাথাব্যথা কিংবা সারাদিন ক্লান্তি অনুভব করার অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। সাধারণত এসব সমস্যাকে পানিশূন্যতা, মানসিক চাপ কিংবা ঘুমের ঘাটতির ফল বলে মনে করা হয়। তবে উপসর্গগুলো যদি নিয়মিত দেখা দেয় এবং এর সঙ্গে রাতে জোরে নাক ডাকা বা ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। এর পেছনে থাকতে পারে স্লিপ অ্যাপনিয়া নামের একটি ঘুমজনিত শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা।

চিকিৎসকদের মতে, স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি রোগ, যা অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন শনাক্ত না হয়েই থেকে যায়। অথচ যথাসময়ে রোগটি নির্ণয় ও চিকিৎসা করা সম্ভব হলে ঘুমের মান উন্নত করার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতেও সহায়তা পাওয়া যায়।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কী?

স্লিপ অ্যাপনিয়া হলো ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যাহত হওয়ার একটি অবস্থা। এর সবচেয়ে পরিচিত ধরন হলো অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ওএসএ)।

ঘুমের সময় গলার পেশি ও আশপাশের নরম টিস্যু শিথিল হয়ে গেলে শ্বাসনালি আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এ অবস্থায় মস্তিষ্ক বারবার শরীরকে জাগিয়ে বা ঘুমের গভীরতা কমিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।

অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে বুঝতেই পারেন না যে রাতে তাঁর ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও তিনি ক্লান্তি অনুভব করতে পারেন, যদিও তাঁর মনে হতে পারে যে তিনি পর্যাপ্ত সময় ঘুমিয়েছেন।

যেসব লক্ষণ অবহেলা করা ঠিক নয়

স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। তবে কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

১. সকালে মুখ ও গলা শুকিয়ে থাকা

রাতে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কারণে সকালে মুখ ও গলা শুকিয়ে যেতে পারে। এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার একটি সম্ভাব্য লক্ষণ হলেও পানিশূন্যতা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা নাক বন্ধ থাকার কারণেও এমন হতে পারে।

২. ঘুম থেকে ওঠার পর মাথাব্যথা

সকালে নিয়মিত মাথাব্যথা হওয়া ঘুমের মান খারাপ হওয়া বা রাতে শ্বাসপ্রশ্বাসে ব্যাঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে মাথাব্যথার আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই শুধু এই লক্ষণ দেখে স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

৩. জোরে নাক ডাকা

নিয়মিত জোরে নাক ডাকা, বিশেষ করে নাক ডাকার মাঝখানে কিছুক্ষণ নীরবতা এবং পরে হঠাৎ জোরে শ্বাস নেওয়ার শব্দ, অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হতে পারে।

৪. ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা

পরিবারের সদস্য বা একই বিছানায় ঘুমানো কেউ যদি লক্ষ্য করেন যে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, হাঁসফাঁস করে শ্বাস নিতে হচ্ছে কিংবা হঠাৎ দম নিয়ে ঘুম ভাঙছে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

৫. দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ও ক্লান্তি

রাতে বারবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে দিনের বেলায় ঝিমুনি, কাজে মনোযোগের অভাব, স্মৃতিশক্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও এমন হলে কারণ অনুসন্ধান করা উচিত।

দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করালে কী ঝুঁকি রয়েছে?

স্লিপ অ্যাপনিয়া শুধু ঘুমের সমস্যা নয়। বিশেষ করে মাঝারি বা গুরুতর অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া দীর্ঘদিন চিকিৎসা ছাড়া থাকলে শরীরের বিভিন্ন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ঘুমের মধ্যে বারবার অক্সিজেন কমে যাওয়া এবং ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার ফলে শরীরে চাপ সৃষ্টিকারী বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়। এতে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ছাড়া হৃদ্‌স্পন্দনের অস্বাভাবিকতা, বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন, হৃদ্‌রোগ এবং স্ট্রোকের সঙ্গে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে এ রোগের সম্পর্ক নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ফ্যাটি লিভারসহ অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

তবে এসব জটিলতা প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা দেয় না। রোগের তীব্রতা, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকির ওপর সম্ভাব্য পরিণতি নির্ভর করে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?

যেকোনো বয়সের মানুষের স্লিপ অ্যাপনিয়া হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। যেমন:

অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছে এমন ব্যক্তি।

যাঁদের গলার শ্বাসনালি তুলনামূলক সরু বা চোয়ালের গঠন শ্বাসনালিতে বাধা সৃষ্টি করে।

মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষ।

যাঁদের পরিবারে স্লিপ অ্যাপনিয়ার ইতিহাস রয়েছে।

যাঁরা নিয়মিত ধূমপান করেন।

যাঁরা অ্যালকোহল পান করেন অথবা ঘুমের জন্য কিছু প্রশান্তিদায়ক ওষুধ ব্যবহার করেন।

তবে স্বাভাবিক ওজনের মানুষ কিংবা তরুণদেরও এ রোগ হতে পারে। তাই কেবল ওজন বা বয়সের ভিত্তিতে ঝুঁকি নির্ধারণ করা ঠিক নয়।

সন্দেহ হলে কী করবেন?

স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম পদক্ষেপ হলো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। প্রয়োজনে চিকিৎসক ঘুমের বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারেন। রোগ নির্ণয়ের জন্য উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের পাশাপাশি স্লিপ স্টাডি বা ঘুমের পরীক্ষা করা হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে বাড়িতে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাস, অক্সিজেনের মাত্রা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। আবার কিছু রোগীর জন্য হাসপাতালে বা বিশেষায়িত কেন্দ্রে পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। কোন পরীক্ষা উপযুক্ত হবে, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

পরিবারের সদস্যদের পর্যবেক্ষণও চিকিৎসককে তথ্য দিতে পারে। রাতে নাক ডাকা, হাঁসফাঁস করে ওঠা বা শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার ঘটনা কখনো লক্ষ্য করা গেলে তা চিকিৎসককে জানানো উচিত। তবে মোবাইল ফোনে অডিও বা ভিডিও ধারণ করা রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়।

চিকিৎসা ও জীবনযাপনে পরিবর্তন

স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসা রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। কিছু ক্ষেত্রে জীবনযাপনে পরিবর্তন উপকারী হতে পারে। যেমন, অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওজন কমানো, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান বন্ধ করা এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিৎ হয়ে ঘুমানোর পরিবর্তে কাত হয়ে ঘুমানো উপকার দিতে পারে।

মাঝারি বা গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসক কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার বা সিপিএপি (CPAP) যন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন। এই যন্ত্র মাস্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত বায়ুচাপ সরবরাহ করে শ্বাসনালি খোলা রাখতে সাহায্য করে। ফলে ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা কমে এবং ঘুমের মান উন্নত হতে পারে।

নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের মুখের যন্ত্র বা অন্য চিকিৎসাপদ্ধতিও বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ ব্যবহার কিংবা চলমান কোনো ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।

সুস্থ থাকতে ঘুমের প্রতি যত্নশীল হোন

সুস্থ জীবনের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা, ঘুমানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত তন্দ্রা দেখা দিলে তার কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে সকালে বারবার মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, জোরে নাক ডাকা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তি একসঙ্গে দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এসব উপসর্গের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে, কিন্তু স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্ভাবনা থাকলে পরীক্ষা করানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

মনে রাখবেন, ভালো ঘুম শুধু সতেজ থাকার জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সুস্থতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র: ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম The Mirror-এ প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদন, “Doctor issues warning to anyone who gets dry mouth or headaches in morning”; চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. সন্দীপ ব্যানার্জি, রেসপিরেটরি কনসালট্যান্ট ও স্লিপ স্পেশালিস্ট, NHS (National Health Service), NHS Inform, Private Sleep Clinic।

আরও