×
×
Thursday, 29 October, 2026, 8:08 am


আইপিওতে ভালো কোম্পানির আকাল: বুক বিল্ডিং ও শেয়ার মূল্য নির্ধারণে কোথায় গলদ?

 

নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে আগ্রহ কম, দাম নির্ধারণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা। বাজার সংস্কারে কী করণীয়, জানালেন বিশ্লেষকেরা।

আইপিওতে ভালো কোম্পানি না আসার কারণ, বুক বিল্ডিং পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা এবং শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের সমস্যা নিয়ে বিশ্লেষণ।

পুঁজিবাজার যে কোনো অর্থনীতির প্রাণ। আর সেই বাজারের প্রাণ নতুন ও মানসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি, যা আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) নামে পরিচিত। কিন্তু দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে: শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো কেন বাজারে আসতে চায় না? বিনিয়োগকারীরাই বা কেন আইপিওতে আগের মতো আস্থা পান না?

বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে দায়ী: আস্থার সংকট, বুক বিল্ডিং পদ্ধতির দুর্বলতা এবং শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতা।

ভালো কোম্পানি কেন আসছে না

দেশে অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ব্যাংকঋণ বা ব্যক্তিগত পুঁজির ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালায়। তালিকাভুক্ত হলে তাদের কাছে সুবিধার চেয়ে বাড়তি দায় বেশি মনে হয়। বিশ্লেষকেরা সাধারণত নিচের কারণগুলো চিহ্নিত করেন:

– কঠোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা: তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, নিরীক্ষা ও তথ্য প্রকাশ করতে হয়। অনেক পারিবারিক বা ঘনিষ্ঠভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান এতে স্বচ্ছন্দ নয়।
– কর-সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা: তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে করহারের পার্থক্য যথেষ্ট আকর্ষণীয় না হলে উদ্যোক্তারা তালিকাভুক্তির ঝামেলা এড়াতে চান।
– বাজারের অস্থিরতা: শেয়ারবাজারে অতীতের ধস ও দীর্ঘ মন্দার স্মৃতি এখনো অনেক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর মনে রয়েছে।
– অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা: আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত সময় ও জটিলতা নিয়ে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ আছে।
– দুর্বল কোম্পানির ভিড়: অতীতে মৌলভিত্তিহীন কিছু কোম্পানি বাজারে এসে দাম পড়ে যাওয়ায় আইপিও-র সামগ্রিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এতে ভালো কোম্পানিগুলোও আগ্রহ হারাচ্ছে।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি কী এবং বিতর্ক কেন

আগে আইপিওতে শেয়ারের দাম নির্ধারণ হতো স্থির মূল্যে, যা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করত। এই পদ্ধতিতে অনেক সময় দাম অযৌক্তিকভাবে কম বা বেশি ধরা হতো বলে অভিযোগ ছিল।

এর বিকল্প হিসেবে আসে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি। এখানে প্রথমে যোগ্য প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (ইলিজিবল ইনভেস্টর) শেয়ারের জন্য দর প্রস্তাব করেন। সেই দরপ্রস্তাবের ভিত্তিতে চূড়ান্ত দাম, অর্থাৎ কাট-অফ প্রাইস, ঠিক হয়। পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ওই দামেই আবেদন করেন। তত্ত্বগতভাবে এতে বাজারই দাম ঠিক করে দেয়।

কিন্তু বাস্তবে এই পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে:

– প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা সীমিত হলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি হয় না।
– দরপ্রস্তাবে যোগসাজশ বা প্রভাবের আশঙ্কা থেকে যায়।
– যে দামে প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কেনেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সেই দামই মেনে নিতে হয়। তাঁদের মত প্রকাশের সুযোগ প্রায় নেই।
– দর নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, তা নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে সংশয় রয়েছে।

মূল্য নির্ধারণের সমস্যা: দাম বেশি, না কম?

আইপিওর সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো শেয়ারের দাম। দাম খুব বেশি ধরা হলে তালিকাভুক্তির পর শেয়ারের দর পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যার ক্ষতি পোহান সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। আবার দাম অস্বাভাবিক কম হলে কোম্পানি তার প্রাপ্য পুঁজি থেকে বঞ্চিত হয়। উদ্যোক্তাদের কাছে সেটিও অগ্রহণযোগ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, আইপিওর দামে প্রকৃত মূল্য, ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা ও খাতভিত্তিক তুলনার প্রতিফলন থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে তা সবসময় ঘটে না। এতে আস্থার সংকট তৈরি হয়, আর সেই সংকটের ফল ভোগ করে পুরো বাজার।

বাজারে এর প্রভাব

ভালো কোম্পানির অভাবে বাজারে বৈচিত্র্য কমে, বিনিয়োগের বিকল্প সীমিত হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা তখন গুটিকয়েক শেয়ারের ওপর ঝুঁকে পড়েন, ফলে বাজার সহজেই গুজব ও কারসাজির শিকার হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর, কারণ কোম্পানিগুলো ব্যাংকঋণের ওপরই বেশি নির্ভর করতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের বিকল্প পথ সংকুচিত হয়।

সমাধানের পথ কী

বাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের পরামর্শের সারকথা এই:

1. বুক বিল্ডিং পদ্ধতির সংস্কার: প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর পরিধি বাড়ানো, দরপ্রস্তাব প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি।
2. যৌক্তিক মূল্যায়নের মানদণ্ড: মূল্য নির্ধারণে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও খাতভিত্তিক তুলনার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশ।
3. প্রণোদনা: তালিকাভুক্ত হতে ইচ্ছুক ভালো কোম্পানিকে কর-সুবিধাসহ আকর্ষণীয় প্রণোদনা।
4. দ্রুত ও সহজ অনুমোদন: আইপিও আবেদনের প্রক্রিয়া সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ করা।
5. বিনিয়োগকারী সুরক্ষা: তথ্য গোপন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।

আইপিও কেবল পুঁজি সংগ্রহের মাধ্যম নয়; এটি কোম্পানি, বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যকার আস্থার সেতুও। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা। তা না হলে ভালো কোম্পানি বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবে, আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা থাকবেন অনিশ্চয়তায়।

[atn_photocard]
আরও