×
×
Thursday, 29 October, 2026, 8:09 am


কেন বন্ধ হয়েছিল ৩০ ব্যাংকের এটিএম সেবা…?

 

৩০ ব্যাংকের এটিএম, কার্ড ও অনলাইন সেবা বন্ধ হয়ে ভোগান্তিতে লাখো গ্রাহক; গভর্নরের নির্দেশে রাতেই সমঝোতা, সেবা চালু

দেশের ৩০টি ব্যাংকের এটিএম, কার্ড ও অনলাইন লেনদেন হঠাৎ অচল হয়ে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়েন লাখো গ্রাহক। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের জানিয়েছিল, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে সেবা সাময়িক বন্ধ থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, আসল কারণ ভিন্ন। তাঁর দাবি, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর রুশ প্রযুক্তি সরবরাহকারীর বকেয়া পাওনা ও চুক্তি নিয়ে বিরোধের কারণেই সেবা বন্ধ হয়েছিল।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, নাকি বাণিজ্যিক বিরোধ?

কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত ব্যাংকগুলোর এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর সেবা একযোগে বন্ধ হয়ে যায়। গ্রাহকদের কাছে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয় ‘সিস্টেম মাইগ্রেশন’।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি (আইটিসিএল) এবং রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের মধ্যকার চুক্তি জটিলতা ও বকেয়া পরিশোধ নিয়ে বিরোধের জেরেই এই বিভ্রাট ঘটে।

১৫ লাখ ডলার বকেয়া, বন্ধ হয় সার্ভিস

ওই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী:

– আইটিসিএল দেশের ৩৩টি ব্যাংককে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও এটিএম সেবা দিয়ে থাকে।
– প্রযুক্তিগত সেবার জন্য প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার কম্পাস প্লাসের ওপর নির্ভরশীল।
– কম্পাস প্লাস আইটিসিএলের কাছে প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার পাওনা দাবি করছে।
– এই পাওনা ও চুক্তি নিয়ে জটিলতায় রুশ প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভিস বন্ধ করে দেয়।

কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, সিস্টেম মাইগ্রেশন নয়, বরং চুক্তি জটিলতা ও বকেয়া পেমেন্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করেই সার্ভিস ডাউন করা হয়েছে।

৪ অক্টোবর রাত থেকে ভোগান্তি

৪ অক্টোবর রাত ৯টার পর থেকে ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহকেরা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়েন। অনেকে এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারেননি। পিওএসে কার্ডে কেনাকাটা, অনলাইন লেনদেন, ই-কমার্স, কিউআর ও এনপিএসবি-সংশ্লিষ্ট কিছু সেবাও অচল ছিল।

বিভ্রাটে আক্রান্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে: অগ্রণী, বাংলাদেশ কমার্স, বাংলাদেশ কৃষি, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক, ব্যাংক আলফালাহ, কমিউনিটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামী, আইএফআইসি, যমুনা, জনতা, মেঘনা, মার্কেন্টাইল, মিডল্যান্ড, মধুমতি, ন্যাশনাল, এনসিসি, এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি গ্লোবাল, রূপালী, শাহজালাল ইসলামী, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, সোনালী, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স, ট্রাস্ট, ইউনিয়ন, উত্তরা ও উরি ব্যাংক বাংলাদেশ।

গ্রাহকদের বলা হয়েছিল ‘সিস্টেম আপগ্রেড’

সেবা বন্ধের পর অনেক ব্যাংক এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের জানায়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট সময় এটিএম, কার্ড ও ডিজিটাল সেবা বন্ধ থাকবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তার দাবি, এর পেছনে ছিল ব্যবসায়িক চুক্তি ও অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত হস্তক্ষেপ

গ্রাহকদের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক আইটিসিএলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে তলব করে। কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী:

– গভর্নর আইটিসিএল কর্তৃপক্ষকে রাতের মধ্যেই কম্পাস প্লাসের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর নির্দেশ দেন।
– স্যুইচিংসহ কার্ড-সংশ্লিষ্ট সব সেবা দ্রুত চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়।
– গ্রাহকস্বার্থ ও লেনদেনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
– কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেও কম্পাস প্লাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

দেশের সব ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ হয়নি

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কিউ-ক্যাশের সমস্যায় কয়েকটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট সেবা বিঘ্নিত হলেও দেশের পুরো ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি।

– এনপিএসবির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত ব্যাংকগুলোর সেবা স্বাভাবিক ছিল।
– মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও অন্যান্য পেমেন্ট সেবা চালু ছিল।
– বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত বিএসিপিএস, বিইএফটিএন ও আরটিজিএস সচল ছিল।

মঙ্গলবার রাতেই সমঝোতা, বুধবার থেকে স্বাভাবিক

কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপ ও উদ্যোগের পর আইটিসিএল ও কম্পাস প্লাসের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং মঙ্গলবার রাতেই কিউ-ক্যাশের সেবা চালু হয়। বুধবার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর সেবা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ব্যাংক এশিয়াসহ কয়েকটি ব্যাংক এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা পুরোপুরি চালুর কথা জানিয়েছে।

অমীমাংসিত প্রশ্ন

৪ অক্টোবর রাত থেকে শুরু হওয়া ভোগান্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়েছে। তবু কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। লাখো গ্রাহককে ‘প্রযুক্তিগত উন্নয়ন’ বলে জানানো হলেও নেপথ্যে কেন ব্যবসায়িক বিরোধ ছিল? আর প্রকৃত কারণ কেন গ্রাহকদের কাছে স্পষ্ট করা হয়নি? আর্থিক খাতের আস্থা ধরে রাখতে এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব জরুরি।

[atn_photocard]
আরও