×
×
Thursday, 29 October, 2026, 8:09 am


ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার: কেন বাড়ছে মৃত্যু, কীভাবে ঠেকাব?

বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জমে থাকা পানির পাশাপাশি মানুষের অসচেতনতা ডেঙ্গু বিস্তারের বড় কারণ; শুধু মশা নিধন নয়, কার্যকর সমাধানে প্রয়োজন নিয়মিত উৎসস্থল ধ্বংস, দ্রুত চিকিৎসা ও সামাজিক অংশগ্রহণ

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের একটি মৌসুমি রোগ নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে এ রোগের সংক্রমণ দেখা গেলেও বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালেও ডেঙ্গুর প্রকোপ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং অক্টোবরেও সংক্রমণ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক সরকারি হিসাবে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি বছরে ৮৮ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ২৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একদিনেই প্রায় দুই হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং নয়জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

এরই মধ্যে ৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২৮১-এ পৌঁছেছে। একই প্রতিবেদনে অক্টোবরে সংক্রমণের হার অব্যাহত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রশ্ন হলো, ডেঙ্গু কেন প্রতিবছর আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে? কেন মশা নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগের পরও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না? শুধু ফগিং বা কীটনাশক ছিটালেই কি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? নাকি সমস্যার শিকড় আরও গভীরে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে ডেঙ্গুকে শুধু একটি মশাবাহিত রোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যক্তিগত আচরণের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

ডেঙ্গু কী এবং কীভাবে ছড়ায়

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত মানুষকে কামড়ানোর পর এডিস মশা ভাইরাস বহন করে এবং পরবর্তী সময়ে অন্য মানুষকে কামড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে Aedes aegypti ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রধান বাহকগুলোর একটি। এই মশা মানুষের বসতবাড়ি ও তার আশপাশে থাকতে এবং ছোট ছোট পানি জমার পাত্রে বংশবিস্তার করতে অত্যন্ত দক্ষ।

এডিস মশার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি দিনের বেলাতেও কামড়ায়। ভোর ও বিকেলের দিকে এর কামড়ানোর প্রবণতা বেশি হলেও দিনের অন্য সময়েও মানুষকে কামড়াতে পারে। ফলে শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গু থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় না। দিনের বেলায়ও শরীর ঢেকে রাখা, জানালা ও দরজায় নেট ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু কেন দিন দিন বাড়ছে

ডেঙ্গু বৃদ্ধির পেছনে একটি মাত্র কারণ কাজ করছে না। বরং বেশ কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এডিস মশার প্রজননের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়া।

১. অনিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত

বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, প্লাস্টিকের বোতল, ড্রাম ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকতে পারে। কয়েক দিন ধরে এসব স্থানে পানি জমে থাকলে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টিপাতের ধরন ও আবহাওয়ার পরিবর্তনও ডেঙ্গুর বিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের চলতি বছরের পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে এবং বৃষ্টির পর সংক্রমণ বাড়তে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

২. অপরিকল্পিত নগরায়ণ

শহর বড় হচ্ছে, কিন্তু অনেক জায়গায় সেই অনুপাতে পানি নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়নি। ভবন নির্মাণ, রাস্তা, ড্রেন, নালা এবং আবাসিক এলাকার নানা স্থানে ছোট ছোট পানি জমার জায়গা তৈরি হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দ্রুত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, অনিয়মিত পানি সরবরাহ এবং পানি সংরক্ষণের অনুপযুক্ত ব্যবস্থা ডেঙ্গু বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

৩. বাড়ির ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা পানি

অনেকে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল বলতে শুধু নোংরা নালা বা বড় জলাশয়কে বোঝেন। বাস্তবে এডিস মশা ছোট পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে।

ফুলের টবের নিচের ট্রে, পরিত্যক্ত বোতল, বালতি, ড্রাম, ভাঙা প্লাস্টিকের সামগ্রী, পুরোনো টায়ার, ছাদে জমে থাকা পানি, এসি বা অন্যান্য যন্ত্রের ট্রে, নির্মাণসামগ্রীর পাত্রসহ বিভিন্ন জায়গা এডিসের সম্ভাব্য প্রজননস্থল হতে পারে।

৪. নির্মাণাধীন ভবন

নির্মাণাধীন ভবন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ইট, বালতি, ড্রাম, পাইপ, প্লাস্টিক, ছাদ এবং অন্যান্য স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে।

একটি ভবনের ভেতরে অল্প কয়েকটি প্রজননস্থল থেকেও বিপুলসংখ্যক মশা তৈরি হতে পারে। তাই শুধু রাস্তা বা আবাসিক এলাকায় অভিযান পরিচালনা করলে হবে না। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত ভবন ও খালি প্লটও নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনতে হবে।

৫. বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা

প্লাস্টিকের কাপ, বোতল, খাবারের প্যাকেট, টায়ার, ক্যান এবং বিভিন্ন পরিত্যক্ত পাত্র বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারে। সঠিকভাবে বর্জ্য অপসারণ না হলে এগুলো মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি জমতে পারে এমন অপ্রয়োজনীয় বস্তু অপসারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।

শুধু ফগিং করলেই কেন ডেঙ্গু বন্ধ হয় না

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ফগিং একটি পরিচিত পদ্ধতি। কিন্তু এটি একা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

কারণ ফগিং মূলত প্রাপ্তবয়স্ক মশা কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু যে পাত্রে মশার ডিম ও লার্ভা রয়েছে, সেগুলো যদি থেকে যায়, তাহলে নতুন মশা তৈরি হতে থাকবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে উৎসস্থল ধ্বংসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। পানি জমার স্থান চিহ্নিত করে তা অপসারণ, পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, মশা উড়ে বেড়ানোর পর তাকে মারার চেয়ে মশা জন্মানোর জায়গাটি ধ্বংস করা অনেক বেশি কার্যকর কৌশল।

জলবায়ু পরিবর্তন কি ডেঙ্গু বাড়াচ্ছে

ডেঙ্গু বৃদ্ধির সঙ্গে আবহাওয়া ও জলবায়ুর সম্পর্ক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ এডিস মশার বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তারের জন্য সহায়ক। দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি ও বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি মশার প্রজননের সুযোগ বাড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট গবেষণাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং মশাবাহিত রোগের বিস্তারের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করে এবং মশার প্রজননের ছোট ছোট উৎস অনেক সময় দ্রুত তৈরি হয়।

কেন ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই মৃত্যু হবে এমন নয়। অধিকাংশ রোগী যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু মারাত্মক আকার নিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তবে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ গুরুতর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে পারে।

মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রোগের গুরুতর পর্যায় সম্পর্কে দেরিতে বুঝতে পারা।

অনেক সময় জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীর পরিবার মনে করে রোগী ভালো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী সময়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি বলছে, গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত অনেক সময় জ্বর চলে যাওয়ার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেখা দিতে পারে।

কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে

ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন:

* তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা
* বারবার বমি
* নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত
* বমির সঙ্গে রক্ত
* পায়খানায় রক্ত
* অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা
* দ্রুত শ্বাস নেওয়া
* শরীর ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
* অতিরিক্ত তৃষ্ণা
* অস্বাভাবিক নিস্তেজতা

এসব গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত হতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু হলে কী করতে হবে

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই নিজের ইচ্ছায় নানা ধরনের ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুতে জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে প্যারাসিটামল ব্যবহারের কথা বলেছে এবং অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো কিছু ওষুধ এড়িয়ে চলতে বলেছে, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী কতটা তরল প্রয়োজন, সেটি চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখে রোগীর অবস্থা বিচার করা ঠিক নয়। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, রক্তপাত, রক্তচাপ, পানিশূন্যতা এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী

ডেঙ্গু থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার কামড় এড়ানো এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শরীর ঢেকে রাখা পোশাক পরা, মশা প্রতিরোধক ব্যবহার, দরজা ও জানালায় স্ক্রিন ব্যবহার, দিনের বেলায় প্রয়োজন হলে মশারি ব্যবহার এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া।

প্রতিটি পরিবারের সাপ্তাহিক মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযান

ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি পরিবার সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ির ভেতর ও বাইরে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

দেখতে হবে:

১. কোনো বালতি বা ড্রামে পানি জমে আছে কি না।

২. ফুলের টবের নিচে পানি আছে কি না।

৩. ছাদে পানি জমে আছে কি না।

৪. পুরোনো টায়ার পড়ে আছে কি না।

৫. পরিত্যক্ত বোতল বা প্লাস্টিকের পাত্রে পানি জমেছে কি না।

৬. পানির ট্যাংক বা সংরক্ষণ পাত্র ভালোভাবে ঢাকা আছে কি না।

৭. ড্রেন বা নালায় পানি আটকে আছে কি না।

৮. নির্মাণসামগ্রীর কোনো পাত্রে পানি জমেছে কি না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত খালি ও পরিষ্কার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার করলে হবে না

একটি বাড়ি পরিষ্কার রেখে পাশের বাড়িতে পানি জমে থাকলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যায়। কারণ মশা কোনো নির্দিষ্ট বাড়ির সীমানা মেনে চলে না।

তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে ব্যক্তিগত দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।

একটি মহল্লা, একটি গ্রাম, একটি ওয়ার্ড বা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে নিয়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করলে ফল অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

আক্রান্ত ব্যক্তিকেও সুরক্ষার আওতায় রাখতে হবে

ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা জরুরি। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর মশা ভাইরাস বহন করে অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

অর্থাৎ, রোগীর ঘরে শুধু রোগীর চিকিৎসা করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। তাকে মশারির মধ্যে রাখা এবং আশপাশের মশা নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের করণীয়

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থাপনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়া যথেষ্ট নয়। রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে:

* নিয়মিত এডিস মশার প্রজননস্থল জরিপ
* ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত লার্ভা পর্যবেক্ষণ
* নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন
* খালি প্লট ও পরিত্যক্ত স্থানে পানি জমা বন্ধ করা
* কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
* ড্রেন ও নালা পরিষ্কার রাখা
* জলাবদ্ধতা দ্রুত দূর করা
* প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত কীটনাশক ব্যবস্থাপনা
* হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি
* জনগণকে নিয়মিত সতর্ক করা
* ডেঙ্গুর তথ্য দ্রুত প্রকাশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এর মধ্যে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, মশার সংখ্যা কমানো এবং মানুষের মশার সংস্পর্শ কমানোর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাতেও জোর দিতে হবে

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে আসেন। এতে চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শয্যার ওপর চাপ বাড়ে।

তাই শুধু ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ার পর হাসপাতাল প্রস্তুত করলে হবে না। আগেই সম্ভাব্য রোগীর চাপ অনুমান করে জনবল, শয্যা, পরীক্ষার সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রস্তুতি থাকা দরকার।

২০২৬ সালের পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে, ডেঙ্গু একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুর সংখ্যা আগস্টের তুলনায় ব্যাপকভাবে বেড়েছিল এবং অক্টোবরেও সংক্রমণ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত সচেতনতা থেকে জাতীয় কর্মসূচি

ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, এই রোগকে শুধু মশা মারার সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না।

এটি পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সমস্যা।

এটি নগর পরিকল্পনার সমস্যা।

এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা।

এটি জনস্বাস্থ্যের সমস্যা।

এটি মানুষের দৈনন্দিন আচরণের সমস্যাও।

একটি পরিবার যদি নিজের বাড়ির পানি জমার স্থান পরিষ্কার করে, একটি মহল্লা যদি সপ্তাহে একদিন সম্মিলিতভাবে পরিষ্কার অভিযান চালায়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান যদি নিয়মিত প্রজননস্থল শনাক্ত করে, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান যদি দায়িত্বশীলভাবে পানি জমতে না দেয় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা দিতে পারে, তাহলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন চিন্তা প্রয়োজন

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এটি ক্রমেই বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশে এক লাখের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৫ সালেও এক লাখের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪১৩ জন মারা যান।

২০২৬ সালের পরিস্থিতি সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে।

এখন প্রয়োজন শুধু আক্রান্তের সংখ্যা গোনা নয়, বরং কোথায় মশা জন্মাচ্ছে, কোন এলাকায় বেশি রোগী হচ্ছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, কোথায় মৃত্যুহার বেশি এবং কোন পরিবেশগত কারণে সংক্রমণ বাড়ছে, সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া।

সাম্প্রতিক সরকারি ড্যাশবোর্ডেও বয়স, এলাকা, বিভাগ, সিটি করপোরেশন এবং মৃত্যুর তথ্য আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই ধরনের তথ্যভিত্তিক নজরদারি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।

শেষ কথা

ডেঙ্গু থেকে মুক্তির পথ কোনো একক ওষুধ, স্প্রে বা সাময়িক অভিযানে সীমাবদ্ধ নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, মানুষের মশার সংস্পর্শ কমানো, আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা এবং রোগের গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া।

একটি ছোট জমে থাকা পানির পাত্র হয়তো একজন মানুষের চোখে তুচ্ছ। কিন্তু সেই পাত্রেই যদি এডিস মশার বংশবিস্তার হয়, তাহলে সেটি পুরো পরিবারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর সূত্র হতে পারে খুব সহজ:

পানি জমতে দেব না, মশার প্রজনন হতে দেব না, মশার কামড় এড়িয়ে চলব, জ্বর হলে অবহেলা করব না এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেব।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের নয়। এটি প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

মশা জন্মানোর জায়গা যত কমবে, ডেঙ্গুর সংক্রমণের সুযোগও তত কমবে। আর রোগী আক্রান্ত হওয়ার পর যত দ্রুত সঠিক চিকিৎসার আওতায় আসবে, গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকিও তত কমানো সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান তাই একদিকে যেমন আধুনিক রোগ নজরদারি ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে তেমনি যুক্ত প্রতিদিনের পরিচ্ছন্নতা, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মানুষের সচেতন আচরণের সঙ্গে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে একটি সচেতন সমাজ, যে সমাজ মশা জন্মানোর পর তাকে মারার অপেক্ষা না করে মশা জন্মানোর জায়গাটিই আগে ধ্বংস করে।

গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য-সতর্কতা: ডেঙ্গু হলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড, অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

 

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির ডেঙ্গু সংক্রান্ত স্বাস্থ্য নির্দেশনা।

[atn_photocard]
আরও