দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বাড়ছে দারিদ্র্য: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একাধিক ঝুঁকি দেখছে বিশ্বব্যাংক
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধীরগতি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকট; ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না পর্যাপ্তভাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির গতি কমে এসেছে, দুর্বল হয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে মূলধনের ঘাটতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতাও কমছে।
সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং সারসহ বিভিন্ন খাতে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও এর একটি বড় অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। বরং তুলনামূলক সচ্ছল অনেক পরিবার এসব সুবিধা পাচ্ছে, অথচ দরিদ্র পরিবারের একটি বড় অংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেশের অর্থনীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’। এতে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে ব্যাংক খাত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, সুশাসন ও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির গতি নেমেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরবর্তী দুই অর্থবছরে তা কমে যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে এটিই ছিল সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।
বিশ্বব্যাংকের মতে, প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ বিনিয়োগের সংকোচন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে নেমে এসেছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যালোচনা, নতুন প্রকল্প অনুমোদনে সতর্কতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতার কারণে উন্নয়ন ব্যয় কমেছে।
শিল্প উৎপাদনে চাপ, সংকটে কর্মসংস্থান
অর্থনৈতিক ধীরগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২ শতাংশ। তবে বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর এই প্রথম কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাত সংকুচিত হয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারেনি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, আবার কেউ উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
বাংলাদেশ একসময় গ্যাস উৎপাদনে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র এবং মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে বড় এলাকায় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
শ্রমবাজারেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ
অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো নারীদের একটি অংশ শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপ না থাকায় বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও স্বস্তি ফেরেনি
দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে গত অর্থবছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
তবে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার নানা সমস্যা এবং অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে রেখেছে।
খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। আগস্টে তাদের প্রকৃত মজুরি আবারও ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে যায়।
বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ, ভর্তুকি ও সুদসহ চলতি ব্যয়, প্রবাসী আয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার কারণে অর্থ সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে বেসরকারি ঋণ ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। ফলে অর্থ সরবরাহের বাড়তি প্রবৃদ্ধি উৎপাদনের পরিবর্তে পণ্যের দাম বাড়ানোর ওপর বেশি চাপ তৈরি করতে পারে।
চার বছরে দারিদ্র্য আরও বেড়েছে
অর্থনৈতিক দুর্বলতার সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্যের ওপর। জাতীয় দারিদ্র্যসীমার হিসাবে দেশে টানা চতুর্থ বছরের মতো দারিদ্র্যের হার বেড়েছে।
২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা বিবেচনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে ওই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
ব্যাংক খাতকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি বলছে বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে গেছে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম হার ১০ শতাংশ।
প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম শিথিল করার ফলে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়নি। বিশ্বব্যাংকের মতে, এর ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা পুরোপুরি প্রকাশ পাচ্ছে না।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জামানতবিহীন তারল্য সহায়তার পরিমাণ ২০২৬ সালের জুনে ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ছয়টি ইসলামি ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা শেষ হলেও অন্যান্য ব্যাংকের ক্ষেত্রে অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন ও আমানত সুরক্ষা আইন পাসকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে বিশ্বব্যাংক। তবে দুর্বল ব্যাংককে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ার কারণে প্রকৃত লোকসান চিহ্নিত করা এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধান পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার ০ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। ছয় বছরের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম নীতি সুদহার কমানোর ঘটনা।
তবে ব্যক্তি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।
গত ২৯ জুন ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা অর্থায়ন ছাড়া অন্যান্য ঋণে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, সুদের ব্যবধান এভাবে নির্দিষ্ট করে দিলে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার জন্য ব্যাংকঋণ পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে। ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বড় প্রতিষ্ঠান অথবা সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। এতে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধন পুনর্গঠনের সক্ষমতাও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রবাসী আয় রেকর্ড করলেও রপ্তানি ও বিনিয়োগে দুর্বলতা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে প্রবাসী আয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে একই সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি ০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে আমদানি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক চাপ বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ১ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ থেকে দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া থেকে পোশাক আমদানি বেড়েছে।
নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা মোট জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা বাড়লেও নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল
অর্থনীতির কয়েকটি দুর্বলতার মধ্যেও বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতি ডলারের গড় আন্তব্যাংক দর ছিল ১২২ টাকা ১০ পয়সা। আগস্টে তা বেড়ে প্রায় ১২২ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়ায়।
টাকার মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিট ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।
রাজস্ব আদায় কম, বাড়ছে সরকারের চলতি ব্যয়
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করতে পেরেছে।
মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে কর রাজস্ব প্রায় ৭ শতাংশ।
সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন এবং অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে। করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার উদ্যোগও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে সরকারের মোট ব্যয় জিডিপির ১১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। চলতি ব্যয় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও মূলধনি ব্যয় ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
নতুন সরকারি বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে মূল বেতন ও ভাতা গড়ে প্রায় ১২০ শতাংশ এবং পেনশন প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় জিডিপির প্রায় ০ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।
সরকারি অর্থায়নের বড় অংশই ব্যাংকনির্ভর
বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে ঋণের সুদ দীর্ঘ সময় উঁচু থাকতে পারে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সরকারি ঋণ জিডিপির ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে সুদ পরিশোধের ব্যয় জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
আগামী দুই বছরেও প্রবৃদ্ধি থাকবে চাপে
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। গত ১০ বছরের গড় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এই কর্মসংস্থান দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে না।
জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। পরবর্তী অর্থবছরে তা সামান্য কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।
একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ১ শতাংশ থাকতে পারে। জ্বালানির দাম, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা এবং সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি মূল্যস্ফীতিকে উঁচু পর্যায়ে রাখার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংস্কারে তিনটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে বিশ্বব্যাংক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।
প্রথমত, ব্যাংক খাত। সম্পদের মান পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকার মতো অবস্থায় আছে এবং কোন ব্যাংক পুনর্গঠন বা সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে, তা নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের মালিক, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনকে লোকসানের দায় বহনের আওতায় আনা এবং নিয়ন্ত্রক ছাড় ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ ও বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, রাজস্ব সংস্কার। করনীতি ও কর প্রশাসনকে পৃথক করা, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অকার্যকর করছাড় ধীরে ধীরে কমানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, ব্যাংক খাত, রাজস্ব ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে।
একদিকে রেকর্ড প্রবাসী আয় বৈদেশিক লেনদেনে কিছুটা সহায়তা করছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও রপ্তানির দুর্বলতা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকট দ্রুত সমাধান না হলে উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন আরও কঠিন হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বার্তাটি তাই মূলত সংস্কার ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার দিকে। সাধারণ ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, ব্যাংক খাতে প্রকৃত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং কর আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত শক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।