×
×
Thursday, 29 October, 2026, 3:39 pm

সরিষার উৎপাদনে বড় অগ্রগতি, পেঁয়াজ সংরক্ষণে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি
সরিষা ও পেঁয়াজে নতুন সম্ভাবনা, কৃষিতে ভরসার জায়গা তৈরি হচ্ছে

বাংলাদেশের কৃষিতে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও কিছু খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে সরিষা উৎপাদনে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো, কৃষকের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং ফসলের অপচয় কমাতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে সরিষার উৎপাদন ছিল ৮ দশমিক ২৪ লাখ মেট্রিক টন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৩৪ লাখ টনে দাঁড়ায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ১৫ দশমিক ৪১ লাখ টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে সরিষার উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

সরিষায় উৎপাদন বাড়ার নতুন চিত্র

বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এ বাস্তবতায় সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধি দেশের কৃষি ও খাদ্য অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করছে। সরিষার আবাদ বাড়লে স্থানীয়ভাবে তেল উৎপাদনের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্যও একটি লাভজনক ফসলের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতে পারে।

সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে উন্নত জাত, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বল্প সময়ে ফলন পাওয়া এবং আমন ধান কাটার পর জমিতে সরিষা চাষের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন এলাকায় উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা চাষ বাড়ছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক জাত নির্বাচন, সময়মতো বপন, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে আরও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

পেঁয়াজে সমস্যা উৎপাদনে নয়, বড় চ্যালেঞ্জ সংরক্ষণ

পেঁয়াজ বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের অন্যতম। দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়লেও ফসল তোলার পর পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। সংরক্ষণে ঘাটতির কারণে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে একদিকে কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন, অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ কমে গেলে আমদানির প্রয়োজন তৈরি হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে এয়ার-ফ্লো প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে কৃষক পর্যায়ে নতুন করে আরও ১৫ হাজার এয়ার-ফ্লো মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

এই প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হলো সংরক্ষণাগারের ভেতরের বাতাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পেঁয়াজের পচন ও ক্ষতি কমানো। সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি হলে কৃষককে ফসল কাটার পরপরই কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা

পেঁয়াজ সংরক্ষণে শুধু এয়ার-ফ্লো প্রযুক্তিই নয়, গবেষণা পর্যায়েও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ হচ্ছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশে কম খরচের IoT-ভিত্তিক পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পচন শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণাটিতে প্রচলিত সংরক্ষণ পদ্ধতির তুলনায় মোট ওজন ক্ষতি কমার এবং বাজারজাতযোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে।

এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কৃষক পর্যায়ে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা গেলে পেঁয়াজের অপচয় কমানোর ক্ষেত্রে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষিতে ভরসার জায়গা তৈরি করতে প্রয়োজন ধারাবাহিকতা

সরিষা ও পেঁয়াজের বর্তমান চিত্র কৃষিতে ইতিবাচক সম্ভাবনার দুটি উদাহরণ তুলে ধরছে। একদিকে সরিষার উৎপাদন কয়েক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, অন্যদিকে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে উৎপাদন বাড়ানোই শেষ কথা নয়। কৃষক যেন ন্যায্য দাম পান, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে, সংরক্ষণ সুবিধা সহজলভ্য হয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আসে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির সাম্প্রতিক সাফল্য এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার তাই কৃষি খাতে একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা দিচ্ছে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, গবেষণা ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কৃষকের কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলে এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমানো ও কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

[atn_photocard]
আরও