কলমেঃ দরিফ আবদুল্লাহ
গোল্লাছুট: মাঠের ধুলোয় চাপা পড়া আমাদের শৈশব
বিকেল হলেই যে মাঠে ধুলো উড়িয়ে ছুটত একদল কিশোর-কিশোরী, আজ সেখানে কেবলই নীরবতা। কংক্রিটের দালানে ঘেরা গ্রামে, স্মার্টফোনের নীল আলোয় হারিয়ে গেছে গোল্লাছুটের সেই চেনা ডাক – “গোল্লা…ছুট!”
একসময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি বিকেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই খেলা। দুই দলে ভাগ হয়ে যেত পাড়ার সব ছেলেমেয়ে। মাঝখানে একটি লাঠি বা গাছের ডালকে কেন্দ্র করে ঘুরত তাদের পৃথিবী। এক দল গোল্লা হয়ে কেন্দ্র আগলে রাখত, অন্য দল প্রাণপণ ছুটে তাদের ছুঁয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। ছোঁয়া লাগলেই সব শেষ। কী সহজ নিয়ম, কিন্তু কী গভীর আনন্দ!
আজ সেই মাঠগুলো নেই। ফরিদপুরের প্রবীণ কৃষক আকবর আলী (৭২) বলেন, “আগে নাঙল রাইখা পোলাপানের খেলা দেখতাম। ওদের চিৎকারে মনে হইত, গ্রামটা বাইচা আছে। অহন পোলাপান ঘরে বইসা মোবাইল টেপে, মাঠে গরুও যায় না।”
গোল্লাছুট শুধু একটি খেলা ছিল না, এটি ছিল আমাদের সামাজিক বন্ধন। এই খেলায় কোনো টাকা লাগত না, কোনো জার্সি লাগত না। লাগত শুধু একটু সাহস, একটু বিশ্বাস আর একসাথে ছুটে চলার আনন্দ। এই খেলাই শিখিয়েছিল কীভাবে দলকে আগলে রাখতে হয়, কীভাবে প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান বলেন, “গোল্লাছুট, হাডুডু, বৌচির মতো খেলাগুলো আমাদের অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এগুলো হারিয়ে যাওয়া মানে আমাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।”
সন্ধ্যা নামছে। দূরে কোথাও আজান হচ্ছে। কিন্তু কোনো মাঠ থেকে আর ভেসে আসছে না “গোল্লাছুট” এর সেই সমবেত চিৎকার। ধুলো জমা মাঠের দিকে তাকালে মনে হয়, সেখানে শুধু খেলাটাই হারায়নি, হারিয়ে গেছে আমাদের একটা আস্ত শৈশব, একটা সরল জীবন।
আমরা কি পারি না, আমাদের সন্তানদের হাত থেকে একবার মোবাইলটা রেখে, আবার সেই ধুলোমাখা মাঠে নিয়ে যেতে? হয়তো ওরাও একবার ছুট দিলে বুঝবে, ভার্চুয়াল জগতের চেয়ে মাটির গন্ধ কতটা আপন।