কৃষকের ফসলের দাম না পাওয়ার মূল কারণ কি?
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর ২০২৬ সালের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের বোরো মৌসুমে দেশের কৃষক এক গভীর অর্থনৈতিক ফাঁদে পড়েছে। একে অর্থনীতির ভাষায় বলে ‘Price Scissors’ বা ‘মূল্য কাঁচি’।
তথ্য বলছে, একজন কৃষক প্রতি মণ (৪০ কেজি) ধান উৎপাদনে খরচ করেছেন ৯২০ থেকে ৯৫০ টাকা। এর মধ্যে সার, বীজ, সেচ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি অন্তর্ভুক্ত। অথচ সেই ধান তাকে বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি মণে সরাসরি লোকসান ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।
বগুড়া, নওগাঁ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের মাঠ পর্যায়ের তথ্যও একই চিত্র দেয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন ব্যয় ২৬ টাকার বেশি, অর্থাৎ মণপ্রতি ১০৪০ টাকারও বেশি। কিন্তু কাঁচা ধান ৭৫০-৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
৩০ টাকা বনাম ৬০ টাকা: মাঝের ২৯ টাকা কোথায় যায়?
প্রতিবেদনের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশ পাইজাম চালের হিসাব।
– কৃষকের হাতে পাইজাম চালের দাম হিসেবে পৌঁছায়: প্রতি কেজি ৩০.৬৫ টাকা
– ভোক্তা সেই একই চাল খুচরা বাজারে কেনেন: প্রতি কেজি ৫৯.৬৯ টাকা
– মাঝের ব্যবধান: প্রায় ২৯.০৪ টাকা
এই ২৯ টাকা পুরোটাই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের পকেটে স্থানীয় ফড়িয়া, মিল মালিকের এজেন্ট, আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী। কৃষক উৎপাদন করেন, ভোক্তা বেশি দামে কেনেন, কিন্তু লাভের গুড় খায় মধ্যস্বত্বভোগী।
কেন এই লোকসান?
১. সরকারি সংগ্রহে জটিলতা: সরকার এবার ৩৬ টাকা কেজি দরে অর্থাৎ ১৪৪০ টাকা মণ দরে ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, গুদামে ধান দিতে ১৪% আর্দ্রতা, পরিবহন খরচ, বস্তা, ব্যাংক হিসাব ও নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতায় পড়তে হয়। তাই বাধ্য হয়ে ৯০০-১১০০ টাকায় খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
২. চাতাল বন্ধ, কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ: রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চলে শত শত ছোট চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারের সিংহভাগ এখন কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে। ফলে কৃষক দর কষাকষির সুযোগ হারিয়েছেন।
৩. উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি: ২০২৬ মৌসুমে ডিজেল সংকট, লোডশেডিংয়ে সেচ খরচ ১৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০০ টাকা ছাড়িয়েছে, শ্রমিক মজুরি বেড়েছে ২০-৫০%।
ফলাফল কী?
একজন কৃষক যদি বিঘাপ্রতি ২০ মণ ধান পান এবং মণপ্রতি ১২০ টাকা লোকসান দেন, তবে শুধু এক বিঘাতেই তার লোকসান ২৪০০ টাকা। ঋণ নিয়ে চাষ করা প্রান্তিক কৃষকের জন্য এটি দেউলিয়াত্বের পথ।
করণীয় কি
১. সরাসরি ক্রয় কেন্দ্র: ইউনিয়ন পর্যায়ে অস্থায়ী ক্রয় কেন্দ্র ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
২. মধ্যস্বত্বভোগী কমিশন নির্ধারণ: ধান থেকে চাল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ মুনাফার সীমা বেঁধে দিতে হবে।
৩. কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে সক্রিয় করা: দৈনিক বাজার দর মনিটরিং ও মোবাইল অ্যাপে কৃষককে জানানো।
৪. উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্য: সরকারি সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণে CPD এর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উৎপাদন খরচের হিসাব আমলে নেওয়া।
কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কিন্তু কাঁচির এক পাশে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্য পাশে বিক্রয় দাম কমছে এই কাঁচি বন্ধ না হলে ২০২৬ সালের বোরো মৌসুম একটি লোকসানি মৌসুম হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে।