×
×
শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ২:১৮ অপরাহ্ণ


ব্যাংক খাতে রেকর্ড লোকসান: কিছু প্রতিষ্ঠানের মুনাফার আড়ালে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার ধস

দেশের ব্যাংকিং খাতে একদিকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নজরকাড়া মুনাফা করেছে, অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংকের বিশাল অঙ্কের লোকসান পুরো খাতকেই টেনে নিয়ে গেছে অন্ধকারে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে দেশের ব্যাংক খাত সার্বিকভাবে লোকসান গুনেছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকাযা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি প্রতিবেদন ও মাসিক পরিসংখ্যানে এই চিত্র উঠে এসেছে।

টানা তিন বছর মুনাফার পর আকস্মিক ধস
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। পরের বছর, ২০২৩ সালে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায়। তবে ২০২৪ সালে এই মুনাফার ধারা নিম্নমুখী হয়ে নেমে আসে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায়। আর ২০২৫ সালে এসে পুরো চিত্রই পাল্টে যায় মুনাফার বদলে পুরো খাত হিসাব করে দেখায় বিশাল অঙ্কের লোকসান।

সংস্কারের চাপে বেরিয়ে এলো আসল চিত্র
ব্যাংক খাতের এই বিপর্যয়কর পরিসংখ্যানের নেপথ্যে রয়েছে চলমান সংস্কার কার্যক্রম। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে ৯টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই বা অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) করা হয়েছে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এই নিরীক্ষায় উঠে এসেছে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্যের ছবি যা এতদিন আড়ালে ছিল।
এই ৯ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, আর বাকি চারটিরও আর্থিক অবস্থা সংকটাপন্ন। স্বাভাবিকভাবেই নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসা প্রকৃত হিসাবেই এসব ব্যাংকের বিশাল লোকসান প্রকাশ্যে এসেছে, যা পুরো খাতের সম্মিলিত হিসাবকেও নেতিবাচক করে তুলেছে।

ইতিহাসে চোখ রাখলে দেখা যায়, এর আগেও সংস্কারের সময় ব্যাংক খাতকে এমন লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। ২০০২ সালে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) উদ্যোগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফেরাতে ও খেলাপি ঋণ কমাতে গঠিত হয় ব্যাংকিং সংস্কার কমিটি। সে সময় স্বাধীন নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসা বাস্তব চিত্রের কারণে ২০০৪ সালে পুরো খাত লোকসান করে ৭৭৬ কোটি টাকা এবং ২০০৬ সালে তা বেড়ে হয় ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এরপর ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের আলোচিত হল-মার্ক কেলেঙ্কারির জেরে পুরো খাতের লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। তবে বর্তমান লোকসানের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে।

কোন ব্যাংকের কত লোকসান
ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর মোট ১০টি ব্যাংক মিলে লোকসান করেছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। তবে ভালো অবস্থানে থাকা দেশি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফার কারণে সার্বিক লোকসানের অঙ্কটি কিছুটা কমে আসে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায়।
লোকসানের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, যার একক লোকসানের পরিমাণ ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। এরপরের অবস্থানে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, যার লোকসান প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংকের লোকসান হয়েছে ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। তালিকায় আরও আছে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা) এবং ইউনিয়ন ব্যাংক (৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা)।
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের লোকসান ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৯৯২ কোটি টাকা।
অন্ধকারেও আলো: যারা করেছে রেকর্ড মুনাফা
সব ব্যাংকের অবস্থা কিন্তু একরকম নয়। বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (এসসিবি) গত বছর একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। দেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করা তিনটি ব্যাংক হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংকের ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সফলতা প্রমাণ করে, সুশাসন ও স্বচ্ছ ঋণ ব্যবস্থাপনা থাকলে দুর্বল অর্থনৈতিক পরিবেশেও ব্যাংক ভালো ফল দেখাতে পারে।

ঋণের ৫৯ শতাংশই এখন ‘দুর্দশাগ্রস্ত’
ব্যাংকের সম্পদ মূলত আমানতকারীদের জমা টাকা থেকে দেওয়া ঋণ ও বিনিয়োগ। এই সম্পদ থেকে যত বেশি আয় হয়, ব্যাংক তত শক্তিশালী থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৫৯ টাকাই এখন পরিণত হয়েছে ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ বা ডিস্ট্রেসড ঋণে, যেখান থেকে ব্যাংক কোনো আয় করতে পারছে না।
গত বছর শেষে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছে, বাকিটা খেলাপি, অবলোপন করা বা আদালতের আদেশে খেলাপি ঘোষণা স্থগিত অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নীতি-নির্ধারক সংস্থাগুলোর কাছে ডিস্ট্রেসড ঋণের সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে সাধারণভাবে যে ঋণ থেকে আয় আসে না বা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ হয় না, তাকেই এই শ্রেণিতে ফেলা হয়। যেহেতু পুনঃ তফসিল করা ঋণের বিপরীতে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ অব্যাহত থাকে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ঋণগুলোকে সরাসরি ডিস্ট্রেসড ঋণের তালিকায় রাখে না।

কী বলছে এই পরিসংখ্যান
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান মূলত দেখাচ্ছে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা সমস্যাগুলো সংস্কারের চাপে এখন প্রকাশ্যে আসছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও দুর্বল তদারকির কারণে জমে থাকা ক্ষতি একসঙ্গে হিসাবের খাতায় উঠে এসেছে। ফলে স্বল্প মেয়াদে পুরো খাতের ছবিটি ভয়াবহ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত চিত্র সামনে আসাকে অনেকেই সংস্কারের একটি প্রয়োজনীয় ও স্বাস্থ্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

তবে চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আগামী দিনগুলোতে এই সংস্কার কতটা সুফল আনে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।

আরও