বাজেট ২০২৬-২৭: করদাতাদের জন্য বড় সুখবর, বাড়ছে করমুক্ত আয়ের সীমা
পাঁচ বছরের রোডম্যাপে ব্যক্তি করমুক্ত আয় বাড়ছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপে করছাড়ের প্রস্তাব।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে করদাতাদের জন্য যেন বড় পাটকেল ফাটানোর অপেক্ষায় রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বিনিয়োগে গতি আনা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে ব্যক্তি আয়কর কাঠামোতে আসছে আমূল পরিবর্তন। মধ্যবিত্তের স্বস্তি থেকে শুরু করে তরুণ ফ্রিল্যান্সার, নারী উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান সবার জন্যই রাখা হচ্ছে বিশেষ প্রস্তাব।
পাঁচ বছরের কর কাঠামো: জানবেন আগেভাগে
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করদাতারা যাতে আগাম পরিকল্পনা করতে পারেন, সেজন্য আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি প্রগতিশীল কর কাঠামো ঘোষণার প্রস্তাব করা হতে পারে। এর ফলে কে কোন আয়সীমায় কত কর দেবেন, তা আগেই জানা সম্ভব হবে।
বড় আপডেট: বাড়ছে করমুক্ত আয়ের সীমা
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। নিচে বিভিন্ন শ্রেণির জন্য প্রস্তাবিত করমুক্ত আয়ের সীমা তুলে ধরা হলো:
সাধারণ করদাতা
· ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষ: ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা
· ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষ: ৪ লক্ষ টাকা
· ২০৩০-৩১ করবর্ষ: ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা
নারী ও সিনিয়র সিটিজেন (৬৫ বছর বা তার বেশি)
সাধারণ সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা বেশি সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ শুরুতে তাদের করমুক্ত সীমা দাঁড়াচ্ছে ৪ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা।
জুলাই যোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত সীমা শুরুতে ৫ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৬ লক্ষ টাকা।
তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতা
তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা রাখা হচ্ছে ৫ লক্ষ টাকা। বিশেষ ছাড় হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতামাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের ক্ষেত্রে প্রতিটি সন্তান বা পোষ্যের জন্য এই সীমা আরও ৫০ হাজার টাকা বাড়ানো হবে।
করের হার: মধ্যবিত্তের ওপর চাপ কমিয়ে
২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য প্রস্তাবিত করের ধাপগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে মধ্যবিত্ত স্বস্তি পান:
আয়ের পরিমাণ করের হার
প্রথম ৩,৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ০%
পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ১০%
পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ১৫%
পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ২০%
পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ২৫%
অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর ৩০%
ধনীদের জন্য অতিরিক্ত কর
২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে ৩ কোটি টাকার বেশি অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩৫% (৫% অতিরিক্ত) কর প্রস্তাব করা হতে পারে। তবে এই উচ্চহারের আওতায় পড়বেন না সাধারণ ও মধ্যবিত্ত করদাতারা।
তরুণ, নারী ও উদ্যোক্তাদের জন্য স্বপ্নের প্রস্তাব
ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন
সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং এবং সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করার প্রস্তাব করা হতে পারে। এটি দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল কর্মসংস্থানকে আরও গতিশীল করবে।
স্টার্টআপ
নতুন উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের জন্য টার্নওভার ট্যাক্স ০% করার সুপারিশ করা হয়েছে। এটি উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রণোদনা।
এসএমই ও নারী উদ্যোক্তা
· ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার সম্পূর্ণ করমুক্ত
· নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত
নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে করছাড়
বাজারে মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য কমাতে চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এটি সাধারণ মানুষের ভোগ্যপণ্যের দাম কিছুটা হলেও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।
অন্যান্য খাতে করছাড়ের প্রস্তাব
স্বাস্থ্য খাত
কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫% অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফের প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে প্রতি ডায়ালাইসিসে খরচ কমবে প্রায় ৬০০ টাকা যা কিডনি রোগীদের জন্য বড় স্বস্তি।
পরিবেশবান্ধব যানবাহন
ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক এবং চার্জিং স্টেশন আমদানির উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ০% করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বিআরটিএ-তে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের অগ্রিম কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সিসি/কিলোওয়াট ভেদে ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ রয়েছে।
স্বর্ণালংকার
স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ০.৫% করার প্রস্তাব হয়েছে। এতে স্বর্ণের বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা কর জালের বাইরে থাকতে উৎসাহিত হবেন।
প্রযুক্তি পণ্য
কম্পিউটার মনিটর, প্রিন্টার ও ফ্ল্যাশ মেমোরি আমদানিতে অগ্রিম কর ৫% থেকে কমিয়ে ২% করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে প্রযুক্তি পণ্যের দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
সেরা করদাতাদের জন্য ভিআইপি সুবিধা
কর ভিত্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি সৎ করদাতাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করতে ‘সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালা’র অধীনে মোট ৬৭ জন সর্বোচ্চ করদাতা পুরস্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ সুবিধাসমূহ:
· জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রণ ও অংশগ্রহণের সুযোগ
· সরকারি হাসপাতালে কেবিন সুবিধা
· সরকারি সার্কিট হাউসে অগ্রাধিকার
· বিমান, ট্রেন বা অন্যান্য যানবাহনের টিকিট প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার
· বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবগুলি চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। করদাতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই এই সম্ভাব্য প্রস্তাবগুলো নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।