×
×
Friday, 30 October, 2026, 7:57 pm


বকেয়া দাবিতে খুচরা সার বিক্রেতাদের অবস্থান

সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত নীতিমালা স্থগিতসহ পুরোনো খুচরা বিক্রেতাদের বহাল রাখার দাবি।

সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত) স্থগিত করে সরকার অনুমোদিত ও দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসা খুচরা সার বিক্রেতাদের বহাল রাখা এবং তাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন খুচরা সার বিক্রেতারা।

সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে খুচরা সার বিক্রেতা অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা খুচরা সার বিক্রেতারা অংশ নেন। ব্যানার, ফেস্টুন ও বিভিন্ন স্লোগানের মাধ্যমে তারা তাদের দাবি তুলে ধরেন।

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, নতুন নীতিমালার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত অনুমোদিত খুচরা বিক্রেতাদের একটি বড় অংশ ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে তারা সরকারি ব্যবস্থাপনার অধীনে কৃষকদের কাছে সার পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ফলে হঠাৎ করে বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হলে শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, এর প্রভাব স্থানীয় পর্যায়ে সার সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।

নীতিমালা স্থগিতের দাবি

অবস্থান কর্মসূচির অন্যতম প্রধান দাবি হলো ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫’ (সংশোধিত) স্থগিত করা। একই সঙ্গে সরকার অনুমোদিত খুচরা সার বিক্রেতাদের কার্যক্রম বহাল রাখার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

তাদের অভিযোগ, নতুন কাঠামোর ফলে বহু বছর ধরে সার বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত খুচরা ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এ ছাড়া ব্যবসা পরিচালনার জন্য নেওয়া ঋণ, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের পাওনা অর্থ আদায় নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, পুরোনো খুচরা বিক্রেতাদের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে নতুন কাঠামো কার্যকর করা হলে তাদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই পূর্বের অনুমোদিত বিক্রেতাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।

বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবি

অবস্থান কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খুচরা সার বিক্রেতাদের বকেয়া পাওনা আদায়। আন্দোলনকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বকেয়া অর্থ নিষ্পত্তির আগে তাদের কার্যক্রম বন্ধ বা পরিবর্তন করা হলে তারা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন।

তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বকেয়া পাওনার হিসাব যাচাই করে দ্রুত তা পরিশোধের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর বিষয়েও উদ্বেগ

খুচরা সার বিক্রেতারা মনে করেন, মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৃষির মৌসুমি চাহিদার সময় সার সরবরাহে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা বিতরণগত জটিলতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি কৃষকের ওপর পড়তে পারে।

এ কারণে সার বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন, স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সার বিতরণ ব্যবস্থায় নতুন নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক

বাংলাদেশে সার বিতরণ ব্যবস্থায় ডিলার নিয়োগ ও খুচরা বিক্রেতাদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। ২০২৫ সালের সমন্বিত নীতিমালার আওতায় ডিলার নিয়োগের কাঠামো পরিবর্তন এবং খুচরা বিক্রেতা বা সাব-ডিলার ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর আগে মে মাসেও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে খুচরা সার বিক্রেতাদের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

সরকারের পক্ষ থেকে নতুন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হিসেবে সার বিতরণে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং কৃষকের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশ মনে করছে, নতুন ব্যবস্থায় তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অবস্থান ও বিনিয়োগের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচিত হচ্ছে না।

আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা

অবস্থান কর্মসূচি থেকে খুচরা সার বিক্রেতারা সরকারের কাছে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানান। তাদের দাবি, কৃষক, সরকার এবং সার ব্যবসায়ীদের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করে একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব।

তারা একই সঙ্গে সরকার অনুমোদিত খুচরা সার বিক্রেতাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং নতুন নীতিমালা কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা করার দাবি জানান।

কৃষি ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

সার বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। তাই সার বিতরণ ব্যবস্থায় যেকোনো বড় পরিবর্তনের প্রভাব কেবল ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, সময়মতো সার প্রাপ্তি এবং সামগ্রিক কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ অবস্থায় খুচরা সার বিক্রেতাদের চলমান দাবির বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একদিকে সরকারের নতুন নীতিমালার লক্ষ্য বাস্তবায়ন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীদের পাওনা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বিষয় দুই দিকের সমন্বিত সমাধানই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

[atn_photocard]
আরও