×
×
সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ৭:৫০ অপরাহ্ণ


মূল্যস্ফীতির চাপ বনাম অর্থনীতির চাকা

​চলতি ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে বাংলাদেশের অর্থনীতি একদিকে যেমন আশাবাদের নতুন আলো দেখছে, অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচকে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। একদিকে উৎপাদন ও সেবা খাতের দ্রুত প্রসারে দেশের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি এবং আসন্ন বিশাল বাজেটের ঘাটতি মেটানোর চাপ নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে।

​চলতি বছরের মে মাসের পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) এবং সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশের অর্থনীতির এই মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে।

​১. অর্থনীতির চাকা সচল হওয়ার আভাস: পিএমআই সূচকে বড় লাফ

​মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে ২০২৬-এ দেশের ব্যবসায়িক গতিপ্রকৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

​রেকর্ড পিএমআই: মে মাসে দেশের পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) আগের মাসের তুলনায় ৮.২ পয়েন্ট বেড়ে ৬২.৮-এ উন্নীত হয়েছে। পিএমআই সূচক ৫০-এর ওপরে থাকার অর্থ হলো অর্থনীতির সম্প্রসারণ।

​খাতভিত্তিক অগ্রগতি: উৎপাদন, নির্মাণ, সেবা ও কৃষি এই প্রধান চার খাতের প্রতিটিতেই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বিশেষ করে তিন মাসের সংকোচনের পর নির্মাণ খাত আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে।

​সেবা ও উৎপাদন খাতের দাপট: সেবা খাত টানা ২০ মাসের মতো এবং উৎপাদন খাত টানা দ্বিতীয় মাসের মতো শক্তিশালী সম্প্রসারণ বজায় রেখেছে। নতুন রপ্তানি আদেশ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি এই গতিশীলতার পেছনে কাজ করেছে।

​তবে উদ্যোক্তাদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এখনো ব্যবসার মুনাফার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে।

​২. মূল্যস্ফীতির চরম চাপ: ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ

​অর্থনীতির চাকা সচল হওয়ার ইতিবাচক খবরের সমান্তরালে সাধারণ মানুষের ওপর চেপে বসেছে মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপ।

​৯.৪২% মূল্যস্ফীতি: মে ২০২৬ মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশে, যা এপ্রিলের (৯.০৪%) তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

​কারণসমূহ: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট, দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতার কারণে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

​আয়ের সঙ্গে অসংগতি: নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সামষ্টিক অর্থনীতির এই অস্থিরতার কারণে দেশের দারিদ্র্যের হার কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ২১.৪ শতাংশে ঠেকেছে।

​৩. আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটির চ্যালেঞ্জ

​আগামী ১১ জুন, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার ব্যবস্থার অধীনে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ বাজেট হতে যাচ্ছে।

​বিশাল আকার: নতুন প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ বড়।

​রাজস্ব ও ঘাটতি: এই বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মোট বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

​ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা: বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার বরাবরের মতোই দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ভরসা রাখছে। নতুন বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

​অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ: অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে। আবার ঘাটতি মেটাতে নতুন টাকা ছাপানো হলে তা চলমান মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

​৪. জিডিপি প্রবৃদ্ধি: লক্ষ্যমাত্রা বনাম দাতা সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন

​আসন্ন অর্থবছরের জন্য সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর সাথে কিছুটা দ্বিমত দেখা যাচ্ছে।

আরও