×
×
Friday, 18 September, 2026, 2:44 pm


বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দ্বিমুখী বাস্তবতাঃ লাভের আড়ালে সাফল্য নাকি আসন্ন বিপর্যয়?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক জটিল ও বৈপরীত্যপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে অবস্থান করছে। একই খাতে একদিকে কিছু বেসরকারি ব্যাংক নজিরবিহীন মুনাফা অর্জন করছে, অন্যদিকে বেশ কিছু ব্যাংক মারাত্মক আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত। এই বৈসাদৃশ্য এখন শুধু অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও এটি গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অর্থনৈতিক চাপের মাঝেও মুনাফার উল্লম্ফন

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা করেছে। কিছু ব্যাংক হাজার কোটি টাকার মুনাফার ঘরে প্রবেশ করেছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের আকর্ষণীয় লভ্যাংশ প্রদান করছে। তবে এই মুনাফার উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তা মূলত বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন নয়।

প্রধানত তিনটি কারণে এই প্রবৃদ্ধি ঘটেছে

সরকারি ঋণ নির্ভর আয়: বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে, যা ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকিমুক্ত আয়ের বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খেলাপি ঋণে নীতিগত ছাড়: পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগে অনেক মন্দ ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো যাচ্ছে, ফলে প্রভিশন কম রাখতে হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক শিথিলতা: নীতিগত নমনীয়তার কারণে ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক অবস্থাকে তুলনামূলক ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে পারছে।

ফলে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা দুর্বল হলেও কাগজে-কলমে মুনাফা বাড়ছে।

মুনাফার আড়ালে চাপা বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মুনাফার একটি বড় অংশ প্রকৃত ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে আসছে না। ঋণ আদায়ে সাফল্য বা নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধির বদলে

ট্রেজারি কার্যক্রম

সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আয়

কম প্রভিশন রাখার সুযোগ

এসবই মুনাফা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে পারলে ব্যাংকগুলো কম সঞ্চিতি রেখে বেশি নিট মুনাফা প্রদর্শন করতে পারছে।

সংকটের প্রতিচ্ছবি: ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি

Islami Bank Bangladesh PLC বর্তমানে এই সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। একসময় শক্তিশালী অবস্থানে থাকা এই ব্যাংক এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপে রয়েছে।

বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ

বিশাল প্রভিশন ঘাটতি

মূলধন ঘাটতির ঝুঁকি

এই তিনটি বিষয় ব্যাংকটির ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলেছে। বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় অনেক বিশ্লেষকের মতে, নীতিগত সহায়তা না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।

করপোরেট প্রভাব ও ঋণ ঝুঁকি

ব্যাংক খাতের দুর্বলতার পেছনে বড় করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

S Alam Group-এর মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণ দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছিল, যার প্রকৃত অবস্থা পরে সামনে আসছে।

এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বরং সামগ্রিক সুশাসনের দুর্বলতার প্রতিফলন।

শেয়ারবাজারে আস্থার অবনতি

ব্যাংকিং খাতের এই অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে পুঁজিবাজারে। একাধিক ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যাচ্ছে।

এর ফলে মার্জিন ঋণ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে

বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বাড়ছে

শেয়ারের দর ক্রমাগত কমছে

ফলস্বরূপ, বাজারে ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা দ্রুত কমে যাচ্ছে।

দুই ভিন্ন বাস্তবতা: শক্তিশালী বনাম দুর্বল ব্যাংক

সব ব্যাংকের অবস্থা এক নয়। কিছু ব্যাংক এখনও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে, যার কারণ

শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন

কম খেলাপি ঋণ

কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

অন্যদিকে দুর্বল পরিচালনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণের কারণে কিছু ব্যাংক ক্রমাগত সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে।

সমাধানের পথ কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল তারল্য সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন—

খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ

ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানো

আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা

দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন বা একীভূতকরণ

দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা

বর্তমান ব্যাংকিং খাতের চিত্র আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা তুলে ধরে। সাময়িকভাবে কাগুজে মুনাফা দিয়ে সংকট আড়াল করা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এখনই বাস্তবভিত্তিক সংস্কার ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

আরও