×
×
Saturday, 19 September, 2026, 4:54 pm


মসলা আমদানিতে ধসঃ রাজস্বে ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি, নেপথ্যের আসল কারণ কি

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মসলা আমদানিতে উল্লেখযোগ্য হ্রাস পাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। চলতি অর্থবছরে একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ১৭.৭৮ শতাংশ কম।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর মসলা আমদানি কমেছে প্রায় ৬২ হাজার মেট্রিক টন। ফলে আমদানি শুল্ক থেকে সরকারের আয়ও কমে গেছে। তবে এই কমতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অবৈধ আমদানি।

আমদানিকারকদের মতে, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মসলা চোরাই পথে দেশে ঢুকছে। এসব পণ্যে কোনও ধরনের শুল্ক বা কর দিতে না হওয়ায় বৈধ আমদানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

বাজার পরিস্থিতি: স্থিতিশীলতা ও দামের বৈচিত্র্য

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সাধারণত মসলার চাহিদা বাড়ে এবং দামও বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় দাম স্থিতিশীল রয়েছে। কিছু মসলার দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে, আবার কিছু পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিশেষ করে এলাচ, লবঙ্গ ও দারুচিনির মতো মসলার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উদাহরণস্বরূপ, সাদা এলাচের দাম ৫,৫০০ টাকা থেকে নেমে প্রায় ৪,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দারুচিনি ও লবঙ্গের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তবে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের মধ্যে বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাইকারি বাজারে দাম কম হলেও খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজিতে ৩০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

সরবরাহ ও মজুত: সংকটের আশঙ্কা নেই

ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, আমদানি কমলেও বাজারে কোনও সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত ও স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে ঈদ উপলক্ষে মসলার ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি দাম বাড়ার আশঙ্কাও কম।

ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে নিয়মিত মসলা আমদানি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও দেশের বাজারে তার বড় প্রভাব পড়ছে না।

রাজস্ব পরিসংখ্যান: পণ্যে পণ্যে বৈচিত্র্য

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের তথ্য অনুযায়ী, গত ও চলতি অর্থবছরের তুলনায় বিভিন্ন মসলার আমদানি ও রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

রসুন আমদানি গত বছরের ১,৩৫,১৫৮ মেট্রিক টন থেকে কমে ৬৯,৫৫৯ মেট্রিক টনে নেমেছে যা প্রায় ৬৩.৫ শতাংশ কম। এলাচ, জিরা ও লবঙ্গের আমদানিও যথাক্রমে ৩১.৭%, ২৮.১% ও ৪১.২% কমেছে। মরিচ আমদানিও প্রায় ২৩% কমেছে।

অন্যদিকে কিছু পণ্যে আমদানি বেড়েছে বা রাজস্ব আয় বেড়েছে, যেমন দারুচিনি ও গোলমরিচ।

অবৈধ আমদানির প্রভাব

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, বৈধ পথে মসলা আমদানি করতে গেলে প্রতি কেজিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুল্ক দিতে হয়, যেমন জিরায় ৩০০-৩৫০ টাকা এবং এলাচে প্রায় ১,৭৫০ টাকা পর্যন্ত। অথচ চোরাই পথে আনলে খরচ হয় মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এই বিশাল পার্থক্যের কারণে অবৈধ আমদানি বাড়ছে এবং বাজারে অসাম্য তৈরি হচ্ছে।

কাস্টমসের বক্তব্য

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত নিত্যপণ্যের আমদানি প্রতি বছর ১০-১২ শতাংশ বাড়ার কথা। কিন্তু এ বছর চাহিদা বাড়ার পরিবর্তে আমদানিই কমেছে, যা বাজারের স্বাভাবিক প্রবণতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১২ ধরনের মসলা আমদানি হয়েছিল ২,১৫,৫৪৫ টন। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১,৫৩,৫৬০ টনে। একই সময়ে রাজস্ব আদায়ও ৫৫৫ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৫৭ কোটিতে নেমে এসেছে।

সারসংক্ষেপঃ
মসলা আমদানিতে উল্লেখযোগ্য হ্রাস ও অবৈধ বাণিজ্যের বিস্তার সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহের কারণে ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরনের সংকট বা মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা আপাতত নেই।

আরও